উদ্যোক্তারা স্বল্পসুদে ঋণ পেলে উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে

সময়: রবিবার, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯ ১০:২৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ইন্সটিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। তাই উদ্যোক্তারা যদি তুলনামূলক স্বল্পসুদে ঋণ পায়- তাহলে তাদের উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। তাই সুদ হার কমানোর পক্ষে মত দেন। সম্প্রতি দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আমাদের ডেপুটি এডিটর এম এ খালেক

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন : আগামী ১ জানুুয়ারি ২০২০ থেকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরের বিদ্যমান অবস্থায় এটা বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব বলে মনে করেন?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : ’৯০-এর দশক থেকে আমাদের দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসৃত হচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির একটি মূলমন্ত্র হচ্ছে সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ সুদের হার নির্ধারণ করে দেবে না। বাজার চাহিদা এবং যোগানের উপর ভিত্তি করেই ঋণের সুদের হার নিরূপিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার ব্যাপারে যে সার্কুলার জারি করেছে তা মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল নীতির পরিপন্থি। আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এখন সুদের হার যদি সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসে তাহলে সেটা অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো হবে। উদ্যোক্তারা তুলনামূলক স্বল্পসুদে ঋণ পেলে তাদের উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড যদি ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হয় তাহলে সেই ব্যাংক তো কিছু লাভ রেখে ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করবে। কাজেই তাদের যদি ৯ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদানে বাধ্য করা হয় তাহলে সেই উদ্যোগ কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উচ্চ মাত্রায় কস্ট অব ফান্ড যদি কমানো সম্ভব না হয় তাহলে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা যাবে না।
শেয়ারবাজার প্রতিদিন : দেশের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর কারণ কি বলে মনে করেন?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আমাদের শেয়ারবাজারের যে দুর্বলতা তা একটি বা দু’টি কারণে সৃষ্টি হয়নি। নানাবিধ কারণেই শেয়ারবাজার ভালোভাবে চলতে পারছে না। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের শেয়ারবাজার সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি। প্রথম থেকেই শেয়ারবাজারে নানা ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা এমনভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন যাতে শেয়ারবাজার ঠিক মতো কাজ করতে পারছে না। শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বলতে যা বুঝায় তা থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। ফলে মাঝেমধ্যেই বাজারে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে। শেয়ারবাজারে নানা ধরনের নিয়মবিরোধী কাজ চললেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বাজার স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য যেসব আইন রয়েছে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যদি বাজারের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করেন তাহলে বাজারের অবস্থা ভালো হবার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং দিন দিন অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে। এতে শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার যে মূল উদ্দেশ্য তা ব্যাহত হতে বাধ্য। যারা স্বল্প পুঁজি নিয়ে শেয়ারবাজারে আসছেন এতে তারাই বেশিভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছেন বা বিনিয়োগে আগ্রহী তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে বাজারের অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে। শেয়ারবাজার কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিকশিত হতে পারবে না। সে অবস্থায় দেশের অর্থনীতির উপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। শেয়ারবাজারের অস্বাভাবিক আচরণ বাজারের জন্য স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘকালীন ক্ষতি করছে। শেয়ারবাজারের এই অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা বোধ হয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্বাভাবিক আচরণ করছে। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। আর মহল বিশেষ তার সুযোগ নিয়ে ফায়দা লুুটে নেবে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
শেয়ারবাজার প্রতিদিন : কয়েকদিন আগে দেখা গেল, যেসব কোম্পানি লোকসানে আছে অথবা বিপুল পরিমাণে ঋণগ্রস্ত তাদের শেয়ারের মূল্য হঠাৎ করেই বেড়ে গেল। এ ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের কারণ কি?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : আমি আগেই এর কারণ ব্যাখ্যা করেছি। আমি মনে করি, বাজারের এ ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে ম্যানিপুলেশন একটি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। শেয়ারবাজার যদি সঠিকভাবে কাজ করতো তাহলে দুর্বল মৌলভিত্তি সম্বলিত শেয়ারের দাম এভাবে বৃদ্ধির কোনো কারণ থাকতো না। বাজার যেহেতু সঠিকভাবে কাজ করছে না তাই মাঝেমধ্যেই কোনো কোনো শেয়ারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব শেয়ারের ফান্ডামেন্টালগুলো দুর্বল তাদের দাম তো বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি দুর্বল মৌলভিত্তি সম্বলিত শেয়ারের দামও বাড়ছে। ফলে মনে করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে যে এখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটানো হচ্ছে। বাজারকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। দুর্বল মৌলভিত্তি সম্বলিত শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ারের প্রতি ঝুঁকে পড়তে পারে। তারা কোনো কিছু বিবেচনা না করেই বেশি মুনাফার আশায় এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা লোকসানের শিকার হবে। বিশেষ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এভাবে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক সময় তারা শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। শেয়ারবাজারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আকৃষ্ট করা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই শেয়ারবাজারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। শেয়ারবাজারের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত অর্থ বাজারে নিয়ে আসা। কাজেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যদি বাজারের প্রতি আস্থা রাখতে না পারেন তাহলে তারা কেনো বিনিয়োগ করতে আসবেন? ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের যদি অশনি সংকেত দিয়ে বারবার বিভ্রান্ত করা হয়, তাহলে তারা হতাশ হতে বাধ্য হবেন। এতে শেয়ারবাজার বিকশিত হবার সম্ভাবনা রুদ্ধ হবে।
শেয়ারবাজার প্রতিদিন : একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার আগে তাকে কি কি বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার আগে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে মনে রাখতে হবে এটা এমনই এক ক্ষেত্র যেখানে প্রতিনিয়তই ঝুঁকি রয়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে যেমন মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা আছে তেমনি এখানে বিনিয়োগ করে লোকসান হবার আশঙ্কাও কম নয়। কারণ শেয়ারের মূল্য স্থির নয়। যে কোনো সময় শেয়ারের মূল্য উঠামানা করতে পারে। তাই বিনিয়োগ করার আগে সবকিছু ভালোভাবে ভেবেচিন্তে করতে হবে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হলে আপনাকে রিস্ক নিতেই হবে। শেয়ারবাজারে স্বল্পকালীন সময়ের জন্য বিনিয়োগ করে লাভবান হবার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই দীর্ঘ বা মধ্য মেয়াদি সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। তাহলে লোকসান হবার আশঙ্কা কম থাকে। যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন তার মৌলিক তথ্যগুলো দেখে নিতে হবে। মৌলভিত্তি ভালো হলে সেই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করলে লাভবান হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বাজারে একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেশি আছে বলেই সেই শেয়ারে বিনিয়োগ করবো তা নয়। দেখতে হবে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা কেমন, তার ফান্ডামেন্টালগুলো কেমন। আমাদের দেশের শেয়ারবাজার যেহেতু এখনো সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই যেসব সিগন্যাল আসে তা সবসময় সত্যি নাও হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাজারে যেসব শেয়ারের মূল্য অনেক বেশি সেই শেয়ার ভালো কোম্পানির নাও হতে পারে। কাজেই একজন বিনিয়োগকারীকে প্রথমেই দেখতে হবে আমি যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করবো তার ফান্ডামেন্টালগুলো কতটা শক্তিশালী। ফান্ডামেন্টালগুলো শক্তিশালী হলে সেই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা কম থাকবে।
এম এ খালেক : আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টর খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। তারা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পুঁজির যোগান দিতে অনেক ক্ষেত্রেই সমর্থ হচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশের শেয়ারবাজার উদ্যোক্তাদের পুঁজি যোগান দেবার ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : একটি দেশের শেয়ারবাজার নানাভাবেই অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। ব্যাংকিং সেক্টর কিন্তু শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের মতো প্রতিষ্ঠান নয়। তারা স্বল্পকালীন ঋণ দিতে পারে। কারণ ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ করে তা স্বল্পকালীন সময়ের জন্য কাজেই সেই আমানত যদি দীর্ঘকালীন সময়ের জন্য শিল্প খাতে বিনিয়োগ করা হয় তাহলে সমস্যা হতে পারে। শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদানের জন্য শেয়ার মার্কেট, বন্ড মার্কেট অবদান রাখতে পারে। এ ছাড়া শিল্প ঋণ প্রদানের জন্য বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংকগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকে যদি শিল্প ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয় তাহলে সেটা তাদের জন্য ঋণ এবং আমানতের মধ্যে মিসম্যাচ হতে পারে। স্বল্প সময়ের জন্য আমানত সংগ্রহ করে তা যদি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা হয় তাহলে মিসম্যাচ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Tagged