১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারি

ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ দাখিলের সময় বাড়লো

সময়: সোমবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৯ ৮:৪০:৩৬ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকা ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের মামলার স্থগিতাদেশ দাখিলের সময় বাড়লো। কোম্পানির প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়ের করা শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার স্থগিতাদেশ ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে। গতকাল রোববার ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হাছিনা রৌশন জাহান এ আদেশ দেন।
জানা গেছে, গতকাল পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের বিরুদ্ধে মামলাটির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ দাখিলের দিন ধার্য ছিল। এদিন আসামিপক্ষ ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের আইনজীবী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ দাখিলের জন্য এক মাস সময়ের আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক সার্বিক দিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ দাখিলের সময় বাড়ানোর বিষয়টি মঞ্জুর করেন। তবে এ দিন রাষ্ট্রপক্ষের (বিএসইসি) কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে কোম্পানিটি অসৎ উদ্দেশে, ইচ্ছাকৃত ভাবে প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করেছে। কোম্পানিটি তাদের শেয়ার বিক্রি জোরদার করার লক্ষ্যে এ পন্থা বেছে নিয়েছে, যা বিএসইসি’র তদন্তে উঠে এসেছে। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১৭ জানুয়ারি ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত মামলা দায়ের করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
এর আগে গত ১৬ অক্টোবর পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। সে অনুযায়ী ওইদিন আসামিপক্ষ ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মোজিবুর রহমান বিশেষ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। তবে তিনি হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ আদালতে দাখিল করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সে জন্য তিনি স্থগিতাদেশটি দাখিলের জন্য আরো সময় প্রয়োজন বলে আদালতে আবেদন করেন। একইসঙ্গে তিনি মামলাটির অন্যতম আসামি ও ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুন নেছার অসুস্থতার কারণে আদালতে উপস্থিতির সময় চেয়ে আবেদন জানান।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হাছিনা রৌশন জাহান সার্বিক দিক বিবেচনা করে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ দাখিল ও আসামি কামরুন নেছার আদালতে উপস্থিতির সময় মঞ্জুর করে ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেছিল।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালের ১৭ জানুয়ারি ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বিএসইসি। পরে মামলাটি দায়রা জজ আদালত থেকে গত ১২ জুন ২০১৫ তারিখে পুঁজিবাজার বিশেষ টাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মামলার নম্বর দেয়া হয় ১৫/১৫। পরে ওই মাসেই মামলাটি চার্জ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট মামলাটির কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ দেন। এরপর থেকেই মামলাটি হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের মামলাটির সর্বশেষ ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হয়েছে। তাই নতুন করে মামলাটির ওপর স্থগিতাদেশ নেয়ার জন্য তারা হাইকোর্টে আবেদনের জন্য সময় চেয়েছে কোম্পানিটি।
ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার মোট ১১ জন আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র একজন আসামি (প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এমডি কামরুন নেছা) জামিনে আছেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।
আসামিরা হলেন- ওয়ান্ডার ল্যান্ড টয়েস লিমিটেড, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও এমডি কামরুন নেছা, মো. মুকতাদুল হক হায়দারী, এএ ভাসওনী, মনোনীত পরিচালক, ফাঙ্কায় চেন, ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কনসাল্টেড লিমিটেড, পরিচালক খান মোহাম্মদ একরামুল্ল্যা, শাহজাহান কবির, সৈয়দ শফিকুল হক, হাবিবুল ইসলাম হক ও মোস্তফা বিল্লাহ খান।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস অসৎ উদ্দেশে, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করেছে। মূলত কোম্পানিটি তাদের শেয়ার বিক্রি জোরদার করার লক্ষ্যে এ পন্থা বেছে নিয়েছে, যা বিএসইসি’র তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
নথিতে বিএসইসি’র তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস লিমিটেড কোম্পানি আইন, ১৯৯৩ এর অধীন নিবন্ধিত জয়েন্ট ভেঞ্চারে পরিচালিত একটি কোম্পানি, যা ১৯৯৬ সালের আগস্টে ৫ কোটি টাকার পুঁজি সংগ্রহের জন্য প্রতিটি শেয়ার ১০০ টাকা করে মোট ৫ লাখ সাধারণ শেয়ার ইস্যুর জন্য প্রসপেক্টাস প্রকাশ করে। ওই প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত কোম্পানির প্রোজেক্ট ডিজাইনে ১০০ ভাগ রফতারিমুখী প্লাস্টিক বডি ইলেক্ট্রনিক (যান্ত্রিক ও ব্যাটারিচালিত) খেলনা ও মাইক্রোমটর (ম্যানুফ্যাকচারিং কাম এসেমব্লিং) এর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা প্রসপেক্টাস বিএসইসিকে প্রদর্শন করে পুঁজি সংগ্রহের জন্য সম্মতি গ্রহণ করে।
এদিকে ১৯৯৫ সালের ১৬ জুন ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস মেশিনারিজ আমদানি করা লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক এর প্রধান শাখার মাধ্যমে মেসার্স এসির্যা ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের অনুকূলে মোট ১৬ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারের একটি এলসি খোলে। ওই এলসি’র বিপরীতে পাঁচটি শিপমেন্ট হয়েছে বলে জানায়। এর মধ্যে সর্বশেষ শিপমেন্টটি ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৬০ মার্কিন ডলারের করা হয়েছে, যা সিঙ্গাপুরের মেসার্স সিটার লাইনস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে বিল অফ লেডিং ইস্যু করা হয়েছে। বিল অফ লেডিং অনুযায়ী ওই শিপমেন্টের মেশিনারিজগুলো ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের অনুকূলে বাংলার মনি ভয়েজ ৫৮ ডব্লিউ ভ্যাসেলের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে দেখানো হয়। পরে সর্বশেষ ওই মেশিনারিজের চালান ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি ওশেন বিল অব লেডিং (লেডিং নম্বর- জিকে/এসএল/সিটিজি ১০১) এবং ১১ জানুয়ারি ইনভয়েজ (ইনভয়েজ নম্বর- এ ১০৬) সংগ্রহ করে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস।
এরপর ১৯৯৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংককে অরিজিনাল শিপিং ডকুমেন্ট হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানায়। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করে জানায় যে, ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের আমদানিকৃত মেশিনারিজগুলো ১০০ ভাগ রাফতানিমুখী খেলনা প্রস্তুত শিল্পে ব্যবহার হবে।
একইভাবে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস বিনিয়োগ বোর্ড থেকেও ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি সার্টিফিকেট (বি.বো./নি.স:-১/২৫৩/৯০/২১৯) সংগ্রহ করে। তবে এর আগেই ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের উল্লিখিত শিপমেন্টের জাহাজ (বাংলার মনি ভয়েজ ৫৮ ডব্লিউ) ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। তবে জাহাজ পৌঁছলেও ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসের সেই শিপমেন্ট আসেনি। ফলে এ বিষয়টি জানিয়ে ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েসকে জানিয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। চিঠিতে জানায়, ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলার মনি ভয়েজ ৫৮ ডব্লিউ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। তবে উল্লিখিত মালামাল ওই জাহাজে লোড করা হয়নি।
পরে প্রসপেক্টাস প্রকাশের পর ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস দাবি করে যে, সাপ্লায়ার উল্লিখিত মেশিনারিজের শিপমেন্ট করে নাই। পরে শিপমেন্ট না আসার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও কোম্পানিটি ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে ৫ কোটি টাকার পুঁজি সংগ্রহের জন্য প্রতিটি শেয়ার ১০০ টাকা করে মোট ৫ লাখ শেয়ার পাবলিক অফারের মাধ্যমে বিক্রির জন্য প্রসপেক্টাস ইস্যু করে।
নথিতে তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আরো উল্লেখ করা হয়, শিপমেন্ট না আসার তথ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড টয়েস জানা সত্ত্বেও প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করেনি। অসৎ উদ্দেশে, ইচ্ছাকৃতভাবে এ বিষয়টি গোপন রেখেছে কোম্পানিটি। বরং কোম্পানিটি সে সময় প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করে যে, ‘উক্ত কোম্পানির হংকং কাউন্টার পার্টি তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চার এগ্রিমেন্টের অধীন ইতোমধ্যে প্ল্যান্টের সকল মেশিনারিজ সরবরাহ করেছে এবং আমদানিকৃত সকল যন্ত্রপাতি ইন্সটলেশন হয়েছে।’
প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিটির সকল তথ্য ‘মিথ্যা ও তঞ্চকতাপূর্ণ’। অন্যভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশে প্রতারণার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে শেয়ার বিক্রি জোরদার করার জন্য এবং শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে প্রসপেক্টাসে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কোম্পানিটি ১৯৯৬-৯৭ থেকে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে মুনাফা করতে না পারায়, বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ প্রদান করেনি। এতে প্রতারিত হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
ফলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ এর ১৭ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৪০৯ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged