পর্ব-৩

কমিশনকে বিতর্কিত করতেই ‘রানার অটো’র নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা

সময়: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ ৯:৫১:৫৫ পূর্বাহ্ণ


সাইফুল শুভ : পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) বিতর্কিত করতেই রানার অটোমোবাইলস নামমাত্র লভ্যাংশ দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশে-বিদেশে মোটরসাইকেল রপ্তানির স্বপ্ন দেখিয়ে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে আসার সুযোগ দেয় কমিশন। কিন্তু পুঁজিবাজারে এসেই কোম্পানিটি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নামমাত্র লভ্যাংশ ঘোষণা দিয়ে বিএসইসিকে বির্তকিত করার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীরা।

জানা গেছে, রানার অটোর ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। এটি আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। আইডিএলসি ইনভেস্টন্টের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এক সময় বিএসইসি‘র কমিশনার ছিলেন। ফলে আইডিএলসি কমিশনে প্রভাব খাটিয়ে প্রিমিয়াম নিয়েছে বলে ধারণা করছে অনেকে। এখন আবার কমিশনকে বিতর্কিত করতে চায় কি-না এসব বিষয় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন।

এ বিষয়ে আইসিবি বিনিয়োগকারী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মহসিন মিয়া ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘বুকবিল্ডিংয়ের আসার সুবাদে (বিডিং প্রক্রিয়ার পর) ১০ টাকার শেয়ারে ৫৭ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে দেয় আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট। অথচ বুক বিল্ডিংয়ের বদলে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আনা উচিত ছিল। তাহলে বিনিয়োগকারীদের এতো টাকা খোয়া যেতো না। রানারের আইপিও-তে বিনিয়োগ না করে যদি ব্যাংকে ডিপোজিট রাখতো, এরচেয়ে দশগুণ মুনাফা পাওয়া যেতো।’

মহসিন মিয়া বলেন, ‘পুঁজিবাজারে আসার পর তারা কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করছে কি না Ñতা খতিয়ে দেখা হোক। আইডিএলসি বুক বিল্ডিংয়ে আসার জন্য কোনো প্রভাব খাটিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তাই রানারের আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। তাদের যে পরিমাণ শেয়ারপ্রতি আয় আছে, সে অনুযায়ী আর্থিক প্রতিবেদন পুর্নবিবেচনা করার সুযোগ আছে। অন্যথায় বিনিয়োগকারীরা বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বর্তমান ঘোষিত লভ্যাংশ অনুমোদন দেবে না।’

এদিকে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকেও বলা হয়, তারাও রানার অটোর লভ্যাংশ নিয়ে বিব্রত। এ বিষয়ে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘রানার অটোমোবাইলস নিয়ে আমরাও আশাবাদী ছিলাম। কোম্পানিটি হয়তো ভালো লভ্যাংশ দেবে। কিন্তু কোম্পানি আমাদের কোনো পরামর্শ নেয়নি। যতোদূর জেনেছি, তাদের ট্রাক ব্যবসা মন্দা গিয়েছে। এ খাতের তালিকাভুক্ত অন্যান্য কোম্পানিরও একই অবস্থা। তারাও ট্রাক ব্যবসায় ভালো করতে পারেনি।’
‘কমিশনের কাছে আইডিএলসি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে কি না’ জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘একটা কোম্পানি এসে ভালো করলে ইস্যু ম্যানেজারের জন্য ভালো। খারাপ হলে ইস্যু ম্যানেজারকে তো প্রশ্নবিদ্ধ করা হবেই। আমাদের তো আরো ইস্যু নিয়ে কাজ করতে হবে। রানারের মতো কোম্পানি যদি বিতর্কিত হয়, সত্যিই দুঃখজনক।’ এ বিষয়ে তিনি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান।

গত কয়েক বছরের আইপিও’তে আসা কোম্পানি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আপত্তি করে আসছে। ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে না বলে তাদের অভিযোগ। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দেয়া হচ্ছে। অথচ বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইস্যু প্রাইসের নিচে নেমে যাচ্ছে। রানার অটোর দরও ইস্যু প্রাইসের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে ইস্যু প্রাইসের নিচে চলে আসার আশঙ্কা করছে বিনিয়োগকারীরা। লভ্যাংশ ঘোষণার পর তিন কার্যদিবসে ৭ টাকা ১০ পয়সা দর কমে। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবারে ৭১ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে আসে। কোম্পানিটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) আসে ৬৭ টাকা।
এ বিষয়ে রানার অটোমোবাইলসের কোম্পানি সচিব নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনকে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রানার অটোর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নজরুল ইসলাম ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে দীর্ঘ বিনিয়োগের মুনাফা দীর্ঘমেয়াদে দেখতে হবে। কোম্পানি যতোটুকু মনে করেছে লভ্যাংশ দিয়েছে। আর যে টাকা শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে, তার পুরোটাই লভ্যাংশ দিতে পারবে না।’
গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভায় রানার অটোমোবাইলস গত ৩০ জুন ২০১৯ তারিখে সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি আলোচিত বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার মধ্যে ১০ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ বোনাস। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়।

সূত্র মতে, সর্বশেষ অর্থবছরে (২০১৮-২০১৯) রানার অটোমোবাইলস শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) করেছে ৫ টাকা ০৭ পয়সা এবং ৩০ জুন ১৯ শেষে শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৬৫ টাকা ৪৯ পয়সা।
কোম্পানিটি গত বছরে পুঁজিবাজার থেকে একশ’ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করার অনুমতি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় আইপিওগুলোর মধ্যে রানার অটোমোবাইলস একটি। ১০ টাকার শেয়ারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বিডিংয়ের মাধ্যমে ৬৭ টাকা করে আইপিও’তে আসে।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৮৪৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged