চকলেট দরে ১১ কোম্পানির শেয়ার

সময়: মঙ্গলবার, জুলাই ২৩, ২০১৯ ৩:২২:২৫ পূর্বাহ্ণ


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ : পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতনের ফলে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১১টির শেয়ার দর বর্তমানে ৪ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে। বর্তমান বাজারে এ টাকায় সাধারণ মানের চকলেট ছাড়া অন্যকিছু পাওয়া যায় না। সে হিসেবে বর্তমানে পুঁজিবাজারে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার চকলেটের চেয়েও কম দরে পাওয়া যাচ্ছে।
গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসইতে) লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের শেয়ার দর সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর মাত্র দেড় টাকায় লেনদেন হয়েছে। যদিও কোম্পানিটির অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। টানা দরপতন আর দিনের পর দিন লোকসান গুনতে গুনতে ইউনাইটেড এয়ারসহ অন্য কোম্পানিগুলো এ অবস্থায় পতিত হয়েছে। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনে রাখা বিনিয়োগকারীদের মাঝে ভয়াবহ উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোমবার লেনদেন শেষে ডিএসই সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কোম্পানিগুলো হচ্ছে- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস,
বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিআইএফসি), তুং হাই নিটিং, ফ্যামিলি টেক্স, কেয়া কসমেটিকস, ঢাকা ডাইং, তাল্লু স্পিনিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, বেক্সিমকো সিন্থেটিকস ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকট, আস্থাহীনতা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসইর দ্বন্দ্ব, ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা, ফোর্সড সেল, আর্থিক খাতের নৈরাজ্য, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন, বোনাস লভ্যাংশে বিধি-নিষেধ, কারসাজির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, পেনিক সেলসহ নানা ইস্যুতে পুঁজিবাজারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি জেড ক্যাটাগরির ১৫টি কোম্পানি নিয়ে ডিএসইর তদন্ত, দু’টিকে ডিলিস্টিং, চারটিকে ওটিসিতে নেয়ার চেষ্টা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা ২০১০ সালে ধসের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
তারা বলছেন, লাগাতার দরপতনে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে তারা আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করছেন। বিশেষ করে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বর্তমান মার্কেটের ওপর বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে পারছেন না। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের একটি শেয়ার চকলেটের দরে লেনদেন হওয়াটা আস্থাশীল মার্কেটের বৈশিষ্ট্য নয়। পাশাপাশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের যথাযথ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। সে জন্য কোম্পানিগুলোর দর তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের সঙ্গে। তিনি ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘এসব লোকসানি কোম্পানিগুলো নামমাত্র ডিএসইতে তালিকাভুক্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিগুলোর সার্বিক আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত থাকার অনুকূলে নয়। কোম্পানিগুলোকে তালিকাচ্যুত করার মতো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ডিএসইর।’
তিনি আরো বলেন, ‘কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানও নতুন করে এই তালিকায় যোগ হয়েছে। তাদের অবস্থাও অনেক খারাপ। এসব কোম্পানিগুলো নিয়ে অনেক সময় জুয়াড়িরা জুয়া খেলে থাকে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এসব কোম্পানি থেকে সাবধান থাকতে হবে।’
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ- দুর্বল কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। সেসব কোম্পানি কয়েক বছর ভালো মুনাফা দেখিয়ে হঠাৎ করে লোকসানিতে রূপ নিচ্ছে। এরপর চলে যাচ্ছে জেড ক্যাটাগরিতে। ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি শেয়ারবাজারে না আসায় বারবার প্রতারিত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিগুলো বারবার বোনাস শেয়ার প্রদান করার ফলে পরিশোধিত মূলধন এতোটাই বেড়েছে যে, এখন লভ্যাংশ প্রদান করাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতো বড় পরিশোধিত মূলধন নিয়ে বছরের পর বছর লভ্যাংশ প্রদান করছে না কোম্পানিগুলো। তাতে এতো কম দরের পরও এসব কোম্পানির শেয়ার আর কিনতে চাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা ‘শেয়ারবাজার প্রতিদিন’- কে বলেন, ‘টানা দর পতনে ভালো কোম্পানির শেয়ার দর এমনিতেই কমে যাচ্ছে। সেখানে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার আরো অনেক বেশি কমেছে। বিশেষ করে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর শেয়ার অনেক বেশি দরপতন হয়েছে। এর ফলে চরম ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। খুব শিগগিরই স্টেকহোল্ডারদের পক্ষ থেকে বড় কোন সিদ্ধান্ত না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।’
ডিএসইর তথ্য মতে, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ লিমিটেড। বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ১ টাকা ৫০ পয়সায়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৮২ কোটি ৮১ লাখ। কোম্পানিটির স্বল্প মেয়াদি ঋণ ১১৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং দীর্ঘ মেয়াদি ১৭৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এর বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৭০ দশমিক ২৬ শতাংশ শেয়ার।
এদিকে ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস লিমিটেড। বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১৬ সালে ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। সিএনএ টেক্সটাইলের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ২ টাকায়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ২৪ কোটি। কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৪ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ৬ কোটি ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে। কোম্পানির মোট শেয়ারের ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এর বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স করপোরশেন লিমিটেড। জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ৭ লাখ। কোম্পানিটির সর্বশেষ লেনদেন হয় ২ টাকা ৫০ পয়সায়। কয়েক বছর ধরে লভ্যাংশ প্রদান করছে না কোম্পানিটি। কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১৫০ কোটি ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ৮৯ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে। আর ৭৬৯ কোটি ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা রিজার্ভ লোকসান রয়েছে।
এছাড়া তুং হাই নিটিংয়ের শেয়ার লেনদেন হয় ২ টাকা ৮০ পয়সায়। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১১ কোটি। ফ্যামিলি টেক্সের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ২ টাকা ৯০ পয়সা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৩৫ কোটি। কেয়া কসমেটিকসের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকায়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১০০ কোটি। ঢাকা ডাইংয়ের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকায়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৮১ লাখ। তাল্লু স্পিনিংয়ের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকা ২০ পয়সায়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকা ৫০ পয়সা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১৬ কোটি ৪১ লাখ। বেক্সিমকো সিন্থেটিকসের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকা ৭০ পয়সা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি। আর আইসিবি ব্যাংকের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয় ৩ টাকা ৭০ পয়সা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৬৬ কোটি ৪৭ লাখ।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৪১৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged