সাধারণ বিনিয়োগকারী সংগঠনসমূহের সঙ্গে পুঁজিবাজার উন্নয়ন বিষয়ক মত বিনিময় সভা বিএসইসির পুনর্গঠন আইপিও

নেটিং ফোর্সড সেল বন্ধের দাবি

সময়: সোমবার, জানুয়ারি ২০, ২০২০ ১২:২০:৫৪ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক : বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলোর নেতারা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পুনর্গঠন, প্রাথমিক গণ-প্রস্তাব (আইপিও), রাইট এবং প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে লোপাট বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ফোর্সড সেল, নেটিং বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ারও দাবি উত্থাপন করেছেন।
গতকাল রোববার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) বোর্ড রুমে সাধারণ বিনিয়োগকারী সংগঠনসমূহের সঙ্গে পুঁজিবাজার উন্নয়ন বিষয়ক মত বিনিময় সভা’য় বিনিয়োগকারী নেতারা এসব দাবি জানান। সভায় বিনিয়োগকারীদের ৮টি সংগঠনের প্রতিনিধি অংশ নেন। আইসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন এতে সভাপতিত্ব করেন।
বাংলাদেশ শেয়ারমার্কেট ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি লুৎফুল গনি টিটু বলেন, বর্তমান কমিশনের উপর কোনো বিনিয়োগকারীরই আস্থা নেই। বিশেষ করে বর্তমান চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে- বাজারে টাকা লাগবে না, এমনিতেই শেয়ারবাজার ভাল হয়ে যাবে। পাশাপাশি আইপিও বন্ধ করতে হবে। বাজার এই মূহূর্তে নতুন আইপিও’র ভার নিতে পারছে না। কোম্পানির মালিক ও ইস্যু ম্যানেজার গেম্বলিং করতে নিম্নমানের আইপিও নিয়ে আসছে। ভাল কোম্পানি আনছেন না তারা। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বিএসইসি’র প্রতিনিধি থাকার কথা, কিন্তু বিএসইসি’র কোনো প্রতিনিধি এজিএমে যান না। ফলে এজিমে কোম্পানির বিপক্ষে কোনো কথা বলা যায় না। কোম্পানির পক্ষ থেকে বাধা দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন।
আইসিবি ইনভেস্টরস্ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মহিন উদ্দিন মিন্টু বলেন, সবার আগে বিএসইসি পুনর্গঠন প্রয়োজন। পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত্ব লাভজনক কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত করতে হবে। যেসব কোম্পানির শেয়ারের দর অভিহিত মূল্যের নিচে আছে- সেসব শেয়ার যেন বাইব্যাক পদ্ধতির মাধ্যমে কোম্পানি নিয়ে নেয়। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের সহজশর্তে ঋণ প্রদান করার পাশাপাশি আইসিবি’র বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে সহজশর্তে ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতে হবে বলেও উল্লেখ করেন।
পুঁজিবাজার জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ হোসেন খন্দকার বলেন, ‘বর্তমানে পুঁজিবাজারের অবস্থা খুবই নাজুক। যে কোনো মূল্যে এই নাজুক অবস্থা থেকে বাজারের উত্তরণ ঘটাতে হবে। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করছি।
শেয়ার ইনভেস্টরস্ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন শামীম বলেন, পুঁজিবাজারে বর্তমানে পুঁজিরই নিরাপত্তা নেই। ব্রোকারেজ হাউজগুলো টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে। শাহ মোহাম্মদ সগির নামে একটি ব্রোকারেজ হাউজ বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে তালাবন্ধ করে দিয়েছে। এতে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই বিএসইসি’র কাছে প্রতিটি ব্রোকারেজ হাউজের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার একটি অংশ রাখা উচিৎ, তাহলে ব্রোকারেজ হাউজগুলো উধাও হয়ে গেলেও বিনিয়োগকারীরা তাদের ক্ষতিপূরণ পাবেন। অন্যথায় ব্রোকারেজ হাউজ যে টাকা নিয়ে পালায়, তার পরিত্যক্ত সম্পদ বিক্রি থেকে তার ১০ শতাংশও আসে না। আইপিও বন্ধ নয়, ভাল কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিনিয়োগকারী মহসিন মিয়া বলেন, পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানির মালিকরা আইপিও, রাইট শেয়ার ইস্যু ও প্লেসমেন্টের মাধ্যমে লুটপাট চালাচ্ছে। জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে আইপিও, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৩৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। অথচ কোনো বছরই নগদ লভ্যাংশ দেয়নি। বোনাস শেয়ার দিয়েছে। বোনাস শেয়ার মানে বিনিয়োগকারীদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়া। বর্তমানে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনের শেয়ারের দর মাত্র ২ টাকা ৬০ পয়সা। তেমনি এপোলো ইস্পাত ঋণের ভারে জর্জরিত ওই সময় তাদেরকে ২৪০ কোটি টাকা তোলার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই এপোলো ইস্পাতের শেয়ারের দর ৩ টাকা ৭০ পয়সা। রিং শাইনও একই পথে হাটছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারে যেটি ঘটছে, এটি ধ্বস। পড়তে পড়তে সূচক এখন তলানীতে। তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত ভাবে ২ শতাংশ ধারণ করতে হবে। অন্যথায় পরিচালকদের কোম্পানিতে কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। অনেকগুলো কোম্পানি রয়েছে যারা এই শর্ত পরিপালন করছে না। এরমধ্যে বেক্সিমকো অন্যতম। মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর জন্য প্রতিবছর বিএসইসি একটি ফি নেয়। আবার সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানও নেয়। এ অবস্থায় যদি বিএসইসি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কিছুটা ছাড় দেয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ভাল লভ্যাংশ দিতে পারবে। বিএসইসি নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। তাই বিএসইসি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। সরকারের কাছে ৫০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দাবি করছি। এর মধ্যে ২৫ হাজার কোটি টাকা আইসিবি’কে এবং বাকী ২৫ হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বিভিন্ন ব্যাংককে দিতে হবে। তারা যেন বাজারে বিনিয়োগের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারে। ইনভেস্টরস্ ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন করতে হবে। কোনো বিনিয়োগকারী অসুস্থ হলে বা মারা গেলে তার পরিবারকে যেন সহযোগিতা করা যায়। ইনভেস্টরস্ প্রোটেকশন ফান্ড এবং বিএসইসি বিভিন্ন সময় নানা অনিয়মে কোম্পানি বা ব্রোকারেজ হাউজকে জরিমানা করে যে অর্থ পায় তার অর্ধেক দিয়ে এ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডে নেটিংয়ের নামে জুয়া বন্ধ করতে হবে। ফোর্সড সেল অন্তত ৬ মাসের জন্য বন্ধ করতে হবে। যদিও আইসিবি ফোর্সড সেল করে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ শেয়ার ইনভেস্টরস্ এসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, আইসিবি’তে গত কয়েক বছর ধরে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হচ্ছে। যদি কেউ অন্তত ৫ বছর না থাকতে পারে, তাহলে কাজ করবেন কিভাবে? তাই বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অন্তত ৫ বছর রাখা হউক। বাংলাদেশ অর্থনীতির সব সূচকে ঊধ্বমুখি ধারায় প্রবাহমান রয়েছে অথচ শেয়ারবাজারে পতন। এ পতনে দায়ি কারা খুঁজে বের করতে হবে। পাকিস্তানের অর্থনীতি বাংলাদেশ থেকে খারাপ অথচ তাদের শেয়ারবাজারের সূচক ৪২ হাজার পয়েন্টে। ভারতের সূচক ৪১ হাজার পয়েন্টের বেশি। অথচ বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সূচক ৯ হাজার পয়েন্ট থেকে ৪ হাজার পয়েন্টে নেমে এসেছে। এটি মেনে নেয়া যায় না। অন্যদিকে একদিনে ২৫ থেকে ৩০টি কোম্পানির এজিএম হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কোম্পানিগুলো নিজেদের লোক দিয়ে এজেন্ডা পাশ করিয়ে নেয়। এ বিষয়গুলোর দিকে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
সভাপতির বক্তব্যে আইসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন বলেন, এক সময় শেয়ারবাজারে আইসিবি’র ভূমিকা ছিল ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। বর্তমানে সেটি ১০ শতাংশের মতো। তাই এখানে আরও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী দরকার। উন্নত বিশ্বে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বেশি, সাধারণ বিনিয়োগকারী কম। আমাদের এখানে ঠিক উল্টো। পরিশেষে তিনি সবার বক্তব্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট তুলে ধরবেন বলে জানান।
সভায় অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলো হচ্ছেÑ আইসিবি ইনভেস্টরস্ ফোরাম, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশন, পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ শেয়ারমার্কেট ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শেয়ার ইনভেস্টরস্ এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শেয়ারমার্কেট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শেয়ারমার্কেট ইনভেস্টরস্ ফোরাম এবং চিটাগাং ইনভেস্টরস্ ফোরাম।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৫৯২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged