পরিচালন মুনাফা বেড়েছে শেয়ারবাজারের ২০ ব্যাংকের

সময়: Monday, January 3rd, 2022 2:06:40 pm


নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদায়ী বছর ২০২১ সালে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ২০ ব্যাংকের। ব্যাংকগুলো হলো- মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এসআইবিএল, এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং আইএফআইসি ব্যাংক।

অপরদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং ডাচবাংলা ব্যাংক। করোনার প্রথম বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের মুনাফায় তেমন না বাড়লেও দ্বিতীয় বছরে বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে ব্যাপক হারে। ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত ৩২টি ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে ২০টি ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। কেবল দুটি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা গত বছরের চেয়ে কম হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালো করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। গত বছরের তুলনায় মুনাফা তিন-চতুর্থাংশ বাড়াতে পেরেছে তারা। তবে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে বরাবরের মতোই ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু মুনাফার প্রবৃদ্ধি খুব একটা বেশি নয়। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আয় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৭৫ শতাংশের বেশি। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ও সিটি ব্যাংকের আয় বেড়েছে ৫৫ শতাংশের বেশি।শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের আয়ও বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

জানা যায়, বরাবরের মতো এবারও দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি সদ্য বিদায়ী বছরে ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে, যা ২০২০ সালের শেষে ছিল ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। মুনাফা ৮০ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে শতকরা হারে মুনাফা বৃদ্ধির হার খুব একটা আকর্ষণীয় নয়, ৩ দশমিক ৪০ ভাগ।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবার মুনাফা করেছে ৭২২ কোটি টাকা। গত বছর পরিচালন মুনাফা ছিল ৪১১ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ৩১১ কোটি বা ৭৫ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক গত বছর পরিচালন মুনাফা করেছিল ৭০০ কোটি টাকা। ৫৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে এবার মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

সিটি ব্যাংকের মুনাফায়ও ব্যাপক উত্থান হয়েছে। এ কোম্পানিটি এবার আয় করেছে ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা। গত বছর মুনাফা ছিল ৭০৪ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ৩৯৭ কোটি টাকা বা ৫৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক মুনাফা করেছে ৭১৭ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৪৮১ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ২৩৬ কোটি টাকা বা ৪৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
প্রিমিয়ার ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ৮৮১ কোটি টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০০ কোটি টাকা। বেড়েছে ২৮১ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ব্যাংক এশিয়ার আয়েও। গত বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭১০ কোটি টাকা। সেটি এবার বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২ কোটি টাকা। বেড়েছে ২৯২ কোটি টাকা বা ৪১.১২ শতাংশ।
২০২০ সালে সাউথ ইস্ট ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৭০ কোটি টাকা। সেটি এবার ছাড়িয়ে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। বেড়েছে ২৮০ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এনআরবিসি ব্যাংক মুনাফা করেছে ৪৫০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৩২৩ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ১২৭ কোটি টাকা বা ৩৯ দশমিক ৩১ শতাংশ।

সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক মুনাফা করেছে ২১০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ১৫২ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে ৫৮ কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এনসিসি ব্যাংক মুনাফা করেছে ৭১৭ কোটি টাকা। ২০২০ সালে মুনাফা ছিল ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা বেড়েছে ১৪৪ কোটি টাকা বা ২৫ দশমিক ১৩ শতাংশ।
পূবালী ব্যাংক মুনাফা করেছে ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৯৩৫ কোটি টাকা। মুনাফা ২০৫ কোটি টাকা বেড়েছে। শতকরা হারে মুনাফা বেড়েছে ২১ দশমিক ৯২ ভাগ।

ইস্টার্ন ব্যাংক বিদায়ী বছরে মুনাফা করেছে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৮৭০ কোটি টাকা। বছরের ব্যবধানে ১৮০ কোটি টাকা মুনাফা বেড়েছে। শতকরা হারে মুনাফা বেড়েছে ২০ দশমিক ৬৮ ভাগ।
যমুনা ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। মুনাফা ১১৩ কোটি টাকা বেড়েছে। শতকরা হারে মুনাফা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭৩ ভাগ।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক মুনাফা করেছে ৭৫০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৬৮০ কোটি টাকা। বছর শেষে মুনাফা ৭০ কোটি টাকা বেড়েছে। শতকরা হারে মুনাফা বেড়েছে ১০ দশমিক ২৯ ভাগ।
এসআইবিএল এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ৫০৩ কোটি টাকা। গত বছর পরিচালন মুনাফা ছিল ৪৬০ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ৪৩ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

এক্সিম ব্যাংক মুনাফা করেছে ৭৮০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে যা ছিল ৭৪১ কোটি টাকা। মুনাফা ৩৯ কোটি টাকা বেড়েছে। শতকরা হারে মুনাফা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৬ ভাগ।
ওয়ান ব্যাংক এবার মুনাফা করেছে ৪৩৩ কোটি টাকা। গত বছর এই মুনাফা ছিল ৩১৫ কোটি টাকা। মুনাফা বেড়েছে ১১৮ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৪৬ ভাগ।

এখন পর্যন্ত যেসব ব্যাংকের হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে ন্যাশনাল ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলার আয় কমার তথ্য পাওয়া গেছে।
সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ২৪৮ কোটি টাকা। আগের বছর এই মুনাফা ছিল ৯৫০ কোটি টাকা। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক আগের বছর পরিচালন মুনাফা বেশি দেখিয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। এবার পরিচ্ছন্ন হিসাব অনুসরণ করাতে মুনাফা কমেছে।

অন্যদিকে, ডাচবাংলা ব্যাংক এবার মুনাফা করেছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আগের বছর মুনাফা ছিল ১ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা কমেছে ৯০ কোটি বা ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
২০২১ সাল শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। তবে তা ২০১৯ সালের চেয়ে কিছুটা বেশি। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুনাফাও দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে, তবে ২০১৯ সালের চেয়ে কম।

গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিক, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিক, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো প্রকাশিত হিসাবে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর সিংহভাগই ভালো করেছে। চতুর্থ প্রান্তিকে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে।

অবশ্য পরিচালন মুনাফা কোনো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে, সেটিই কোনো ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা। এই মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফাই হলো একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জোয়ার। নভেম্বর পর্যন্ত ২০২১ সালে বাংলাদেশের আমদানি ৫৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার কোটি ডলারে। ডিসেম্বরের হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। তবে নভেম্বরের প্রবণতার ভিত্তিতে বছরের শেষ মাসে ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

ব্যাংকাররা বলছেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর আমদানি-রপ্তানির জোয়ারে এলসির কমিশন ব্যাংকের মুনাফা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে নভেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কেবল নভেম্বরেই হয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৪ বা ৪০৪ কোটি ডলার। এই প্রবণতার ভিত্তিতে গোটা বছরে রপ্তানি ২৫ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরেকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার বলেন, ‘করোনার সময় ব্যাংকগুলো ভয়ে খরচ অনেক কমিয়েছে। ডিপোজিটের বিপরীতে সুদহারও কমেছে। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি বাড়ায় এলসি বাবদ আয় হয়েছে অনেক বেশি। এ কারণে ব্যাংকগুলো এবার ভালো মুনাফা করেছে।

পাশাপাশি করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়েছে দুই অঙ্কের ঘর। এর পাশাপাশি করোনার দ্বিতীয় বছরেও ব্যাংকগুলোকে দেয়া ছাড় মুনাফা স্ফীত হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে।

এবার বছরের শেষ ভাগে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে। ব্যাংকের সুদকে আয় হিসেবে দেখাতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো কোনো একক গ্রাহকের কাছ থেকে ২০২১ সালে যে সুদ আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে, তার ২৫ শতাংশ যদি আদায় করতে পারে, তাহলে ওই গ্রাহকের কাছ থেকে সুদ বাবদ পাওয়া অর্থের পুরোটাকে আয় হিসেবে দেখাতে পারবে।
নতুন নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা করা সহজ হয়েছে। কারণ, সাধারণত পুরো টাকা আদায় না হলে তা খেলাপি হয়ে যায়। সুদও আয় খাতে নেয়া যায় না।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

 

নিউজটি ৯৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged