বিশেষজ্ঞদের অভিমত : প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগে ঘুরে দাঁড়াতে পারে পুঁজিবাজার

সময়: সোমবার, জুলাই ২২, ২০১৯ ৪:১৮:২৩ পূর্বাহ্ণ


নাজমুল ইসলাম ফারুক : পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে মন্দা পরিস্থিতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় অবস্থানে রয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। বাজারের বর্তমান অবস্থায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না তারা। এছাড়া দুর্বল ও খারাপ কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির কারণেও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। ফলে একদিকে বাজার যেমন ইতিবাচক মোড় নিচ্ছে না, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও প্রতিদিন তাদের পুঁজি হারাচ্ছেন। তবে এ অবস্থায়ও সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টরা তাকিয়ে রয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দিকে।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হলেই মন্দা বাজারে গতি ফিরে আসতে পারে এবং বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সব সময়ই ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করেন। যা বাজারকে ইতিবাচক রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অবস্থানে আশান্বিত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

পুঁজিবাজার শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা অধ্যাপক আবু আহমেদ ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘বর্তমান পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ কার্যক্রম খুবই কম। বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ’ (আইসিবি)-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা সবসময়ই নিরাপদ বিনিয়োগ পছন্দ করেন। যার প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে। এ খাতে টার্গেট গ্রুপ ছাড়াও অন্যরা বিনিয়োগ করে। যদিও টার্গেট গ্রুপের নিকট সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে সরকার চলতি বাজেটে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তার প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। বিপরীত দিকে ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কম হলেও নিরাপদ। ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ করে দুইভাবে মুনাফা করা যায়। এর মধ্যে একটি ক্যাপিটাল এবং অন্যটি ডিভিডেন্ড গেইন। বর্তমান বাজারে ক্যাপিটাল গেইন হচ্ছে না। কিন্তু ডিভিডেন্ড ইল্ড যা হচ্ছে তা খুবই সামান্য। যেখানে ব্যাংকে আমানত রাখলে ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। সেখানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে তার চেয়ে অনেক কম মুনাফা হয়। সে ক্ষেত্রে যেখানে মুনাফা বেশি সেখানেই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে দেশের ব্যাংকগুলো প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন প্রকল্প সম্প্রসারণ করতে পারছে না। তাহলে তারা কীভাবে বিনিয়োগ করবে? বিপরীত দিকে পুঁজিবাজারের অবস্থাও খারাপ। তাই বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে।’

বেশ কয়েকজন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য হতে পারে পুঁজিবাজার। কিন্তু এ বাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। সেই সঙ্গে বাজারে তালিকাভুক্ত হলে একটি কোম্পানিকে অনেক কমপ্ল্যায়েন্স পরিপালন করতে হয়। ফলে ভালো ও বড় কোম্পানিগুলো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অর্থ উত্তোলনে অনীহা রয়েছে। যারা বাজারে আসছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই আইপিও-তে আসার সময় বেশি মুনাফা দেখায়। বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে দুর্বল চিত্র প্রকাশ পায়। এক পর্যায়ে সেগুলো ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পায়। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার যেসব কারণ রয়েছে এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দুর্বল ও খারাপ কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা। এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।

তারা আরো জানান, মন্দা বাজারে বিনিয়োগের পরপরই লোকসানে পড়তে হয়। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা ঝুঁকি জেনেই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু বর্তমান বাজারে ঝুঁকির পরিমাণ কয়েকগুন বেড়েছে। এতোটা অনিশ্চয়তা জেনে কেউ বিনিয়োগ করতে যাবে না। তবে কিছুটা স্থিতিশীল হলে বাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।

এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দেশের অর্থনীতিসহ সার্বিক বিষয়কে সামনে রেখে বিনিয়োগ করে। এসব বিনিয়োগ আবার তাদের পলিসি অনুযায়ী হতে হয়। তাদের পলিসিতে সাপোর্ট না করলে বাজারে তারা নিষ্ক্রিয় আচরণ করেন বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) মহাসচিব ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকার ও ডিলারদের হাতে সোর্স অব ফান্ড নেই। যে কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছে থাকলেও বিনিয়োগ করতে পারছে না। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বাজারের স্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে। যদিও লাইন অব ক্রেডিটে টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে সুদের হার বেশি থাকায় সেটা করতে পারছে না অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।’

তিনি আরো বলেন, ‘মানি মার্কেটে তারল্যের টানাটানি রয়েছে, এর প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। অর্থবাজারের সঙ্গে পুঁজিবাজারের যোগসূত্র থাকায় আর্থিক বাজার খারাপ অবস্থায় থাকলে পুঁজিবাজারেরও উন্নতি হয় না। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যদি স্বল্প সুদে ঋণ পায় তাহলে শেয়ারবাজারে নতুনভাবে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ একটি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘ মন্দার বাজারে বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আটকে গেছে। বিপরীত দিকে ঈদকে সামনে রেখে মানি মার্কেট নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ছে। তাই এ মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে মন্দা বাজারে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে না। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে বিনিয়োগ করলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হবে।’

এদিকে সম্প্রতি পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগে এক্সপোজার সীমায় বড় ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অ-তালিকাভুক্ত বন্ড, ইক্যুইটি শেয়ার, প্রেফারেন্স শেয়ার, ডিবেঞ্চার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগসীমার বাইরে রাখা যাবে। এর ফলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট থাকায় সেই পরিমাণ অর্থ পুঁজিবাজারে আসছে না।

গত জুনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ১৬২ কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর শেয়ার ধারণ বেড়েছে। আলোচ্য মাস শেষে ৩১৭ কোম্পানির মধ্যে ৩০৭টির তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে মোট শেয়ার বিবেচনায় সর্বাধিক ৭ শতাংশ শেয়ার বৃদ্ধি হয়েছে আনলিমা ইয়ার্নে। গত মে মাসের শেষে আনলিমা ইয়ার্নে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ছিল মোটের ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা ১১ দশমিক ০৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বেড়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৪১০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged