আস্থা সঙ্কটের কারণে তারল্য সঙ্কট

বৈদেশিক উৎস ও এডিপি তহবিল থেকে ঋণ চায় অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান

সময়: সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ ১০:৪২:০৮ পূর্বাহ্ণ


সোহেল রহমান : গ্রাহকদের আস্থার সঙ্কটের কারণে নতুন আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানিগুলো। ফলে তারল্য সঙ্কটে ভুগছে এ খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। এমতাবস্থায় তারল্য সঙ্কট কাটিয়ে ওঠতে বৈদেশিক উৎস থেকে সহজ শর্তে নমনীয় ঋণ গ্রহণ এবং ৬ শতাংশ হার সুদে এডিপি তহবিলে সরকারি আমানত চান এ খাতের উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের আধিক্য ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ‘ইন্সাইডার লেন্ডিং’ (অভ্যন্তরীণ ঋণ)-এর কারণে এ খাতের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বর্তমানে নাজুক হয়ে পড়েছে। নাজুক পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যেই ‘পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি অবসায়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আরও দুটি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের এ্যালার্মিং অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় দুর্বল ও অদক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো অবসায়ন বা একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক পর্যালোচনা বৈঠকে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তাদের সমস্যা ও তহবিল সঙ্কট দূরীকরণে ৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মন্দ ঋণগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা; ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট’ ও অর্থঋণ আদালত আইনে দায়েরকৃত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পৃথক আদালত স্থাপন; বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানিগুলোকে অনুমতি প্রদান; আইডিএ-এডিবি ও এআইআইবি থেকে সহজ শর্তে নমনীয় ঋণের ব্যবস্থা করা; ‘বিশেষ অর্থনৈতিক জোন’ ও হাইটেক পার্কে কর-অব্যাহতি প্রাপ্ত-বিনিয়োগকৃত অর্থ গ্রহণে সুযোগ দেয়া এবং বার্ষিক ৬ শতাংশ সুদে এডিপি তহবিলের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দেয়া।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম জানান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৩টি লিজিং কোম্পানিসমূহ মোট ৩৪টি বিভিন্ন লিজিং কোম্পানি বর্তমানে দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এসব লিজিং কোম্পানি কর্তৃক গ্রাহকদের মেয়াদি আমানতের টাকা যথাসময়ে ফেরত না-দেয়া বা ফেরত প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা বিভিন্ন ধরণের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে বিভিন্ন মিডিয়াসহ নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিকারের জন্য বারবার আবেদন ও অভিযোগ করছেন। এ প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের মেয়াদোত্তীর্ণ আমানতের সুদসহ ফেরত প্রদানের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নির্দেশনার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানত গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করছে, ফলে এতে একটি অসঙ্গতি দেখা দিচ্ছে। অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন ও কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে, কেন ন্যায়নিষ্ঠভাবে ও নিয়মন্ত্রিক উপায়ে ঋণ প্রদান সম্ভব হচ্ছে না Ñতা দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। যথাযথ জামানত গ্রহণ নিশ্চিত করে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে ঋণ প্রদান করা এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নির্দেশ দিয়ে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী তাদের বলেছেন যে, অন্যথায় দুর্বল ও অদক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো অবসায়ন বা একীভূত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ সুদের হার নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।’
এছাড়া ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট’, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১’, ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যাক্ট ১৯৯৩’, ‘ইনসলভেন্সি অ্যাক্ট’, এমালগেমেশন অ্যাক্ট’ ইত্যাদি যুগোপযোগী করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
সূত্রমতে, বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ লিজিং কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘লিজিং কোম্পানিসমূহের মধ্যে ৩টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পিপলস লিজিং এর অবসায়ন করা হয়েছে এবং অন্য ২টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থার উন্নতি না হলে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এদেরকেও সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা যায়, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সঙ্কটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বৈঠকে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন্স প্রমোটার্স এসোসিয়েশন’-এর সভাপতি মতিউল ইসলাম বলেন, ‘এ খাতের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে অর্থায়নের উৎসসমূহ চিহ্নিত করা। বিশেষত: কিছু অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানি গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের মধ্যে এ খাত সম্পর্কে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নতুন করে আমানত সংগ্রহ করা প্রায়শই সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহী নয়। এসব কারণে সার্বিকভাবে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানিগুলোতে পর্যাপ্ত তহবিলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে।’
বৈঠকে ‘ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’-এর চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, “আর্থিক খাত বর্তমানে ক্যান্সারে আক্রান্ত। ‘ইনসাইডার লেনডিং’-এর এর কারণে এ সকল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।”
বিআইএফএফএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এখলাসুর রহমান বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানির মালিকরা তাদের প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানতসমূহ ঋণ হিসেবে নিয়ে চলে গেছেন। এর ফলে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়েছে।’ এ সকল মালিকদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা করার পরামর্শ দেন তিনি।
‘প্রিমিয়ার লিজিং’-এর চেয়ারম্যান এজেডএম আকরামুল হক বলেন, ‘অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান/লিজিং কোম্পানিসমূহ তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। এর মূল কারণ খেলাপি ঋণের আধিক্য এবং বহিরাগত প্রেসারগ্রুপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিয়মবর্হিভূত কাজ।’
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৫৩০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged