২০১৯ সাল

আইডিআরএ’র গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ পদক্ষেপ

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯ ৮:০৯:১০ পূর্বাহ্ণ


অনুপ সর্বজ্ঞ : বীমা খাতের উন্নয়নে সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচ পদক্ষেপ হলো- ইউনিফাইড ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্ম (ইউএমপি) চালুর নির্দেশনা, অবৈধ কমিশন বাণিজ্য বন্ধে সিঙ্গেল অ্যাকউন্ট ব্যবহারের নির্দেশ, বীমা আইনের ত্রুটিপূর্ণ ধারাগুলো সংশোধনে কমিটি গঠন, পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভুত কোম্পানিগুলোকে ডিসেম্বরের মধ্যে তালিকাভুক্তির নির্দেশ এবং বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ প্রবিধানমালা চূড়ান্তকরণ।
আইডিআরএ সদস্য বোরহান উদ্দীন দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনকে বলেন, এই পাঁচ পদক্ষেপ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে এ খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে। গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি আয় বাড়বে বীমা কোম্পানিগুলোরও। মূলত খাতটিতে স্বচ্ছতা আনতে আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ পদক্ষেপ।
বীমা গ্রাহকদের প্রিমিয়ামের টাকা পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য মুঠোফোনে খুদে বার্তা মাধ্যমে দেয়ার লক্ষ্যে ইউনিফাইড ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্ম বা ইউএমপি’র চালুর নির্দেশনাপত্র এ বছরের জানুয়ারিতে জারি করে আইডিআরএ। তবে এ সার্ভিস চালু হলে খাতটিতে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। কারণ এ জন্য প্রতিটি পলিসির বিপরীতে বছরে ৩২ টাকা চার্জ গুণতে হবে বীমা কোম্পানিগুলোকে। এর সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে প্রতিটি গ্রাহককে ম্যাসেজ পাঠাতে বছরে খরচ হবে ৪০ টাকা। তাই ইউএমপি বন্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দারস্থ হয়েছে বীমা খাতের মালিকপক্ষ। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, উন্নত গ্রাহকসেবা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনায়ন, এজেন্ট কর্তৃক প্রিমিয়াম আহরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা সুদৃঢ় করার অংশ হিসেবে ইউএমপি’র উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউএমপি’র মাধ্যমে প্রত্যেক বীমা গ্রাহককে এসএমএস’র মাধ্যমে লেনদেনের নোটিফিকেশন পাঠানো হবে। এর ফলে স্বচ্ছতা ও আস্থা অনেকাংশেই প্রতিষ্ঠিত হবে, যা দ্বারা বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি উপকৃত হবে। ইউএমপি বাস্তবায়নের কারণে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কোম্পানিগুলোকে পৃথকভাবে কোন যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে না। ফলে খরচ কমে আসবে এবং তামাদি পলিসিও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
এদিকে, প্রিমিয়ামের টাকা জমা করতে যেকোনো পৃথক তিনটি তফসিলি ব্যাংকে একটি করে সর্বোচ্চ তিনটি হিসাব রাখতে পারবে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো। এমন নির্দেশনা দিয়ে গত ২ জুলাই নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইডিআরএ বলছে, বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত কমিশন দেয়ার প্রবণতা বাড়ছেই। ১০০ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই কমিশন দেয় কোনো কোনো কোম্পানি। তবে এর কোন হিসাব নেই। আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো হয় আইন মেনেই ১৫ শতাংশ কমিশন দেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে দেয়া এ কমিশনের হিসাব মেলাতে কোম্পানিগুলো তাদের সংগ্রহ করা প্রিমিয়াম প্রদর্শন করে না। কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ পলিসি করে, কাগজপত্রে তার অর্ধেকেরও কম দেখানো হয়। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পলিসির তথ্য গোপন রেখে তৈরি করা হয় আর্থিক প্রতিবেদন। এক্ষেত্রে কোম্পানির নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এসব হিসাবের মাধ্যমেই পরিশোধ করা হয় অতিরিক্ত কমিশনসহ কোম্পানির নানা ধরনের অবৈধ ব্যয়ের অর্থ। বীমা খাতে এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধের উদ্দেশ্যেই প্রিমিয়াম জমাকরণে তিনটির অতিরিক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।
বীমা খাতের কোম্পানিগুলোকে অনুমোদন পাওয়ার তিন বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হয়। কিন্তু তিন বছর সময়সীমা পার হওয়ার পরও ২৭টি বীমা কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এর মধ্যে পুরনো কোম্পানি ১২টি ও নতুন ১৫টি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক তালিকাবহির্ভুত কোম্পানিগুলোকে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। অন্যথায় বীমা আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানায় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি। তবে সময় বেধে দেয়ার পরও গত আড়াই মাসে মাত্র দু’টি কোম্পানি বিএসইসি’র কাছে তালিকাভুক্তির আবেদন করেছে। গত ১৭ ডিসেম্বর তালিকাবহির্ভুত ২৭টি বীমা কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি জানতে এক বৈঠকে বসে আইডিআরএ। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত রোডম্যাপ পর্যালোচনা করে আইডিআরএ বলছে তালিকাবহির্ভুত ২৭টি বীমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৯টির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত এ কোম্পানিগুলোই আর্থিকভাবে শক্তিশালী। আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর মধ্যে নতুন ৫ ও পুরোনো ৪টি বীমা কোম্পানি রয়েছে।
এদিকে, বীমাখাতের উন্নয়ন এবং বীমা গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণে আইন ২০১০ এর ত্রুটিপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক ধারাগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ। এরই মধ্যে গত ২৪ নভেম্বর বীমা কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীসহ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, ইন্স্যুরেন্স ফোরাম এবং ইন্স্যুরেন্স সার্ভেয়র্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে প্রস্তাবনা চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। আগামী ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সংশোধনী প্রস্তাব পাঠাতে হবে। এর আগে এ বছরের সেপ্টেম্বরে বীমা খাতের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে বীমা কোম্পানিগুলোর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বীমা আইন ২০১০ এর সঙ্গে ব্যাংকিং আইন, মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি আইন, কোম্পানি আইন এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনসহ সংশ্লিষ্ট বিধি বিধানের সাংঘর্ষিক ধারাগুলো সংশোধন করার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর এ বছরের নভেম্বরে চূড়ান্ত হয়েছে সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ প্রবিধানমালা। ২০১১ সালে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠনের পরপরই এ প্রবিধানমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ‘সাধারণ বীমা কোম্পানির সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ প্রবিধানমালা ২০১৯’ অনুযায়ী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদিত এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানির অগ্রাধিকার বা সাধারণ শেয়ারে সম্পদের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো। এছাড়া সম্পদের ১৫ শতাংশ ডিবেঞ্চারে এবং মিউচ্যুয়াল ও ইউনিট ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে সম্পদের ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ‘এ’ ক্যাটাগরির তফসিলি ব্যাংকে সম্পদের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত স্থায়ী বা চলতি আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখতে পারবে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো। তবে শর্ত হলো একটি ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ সম্পদের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। অন্যদিকে জীবন বীমা কোম্পানির সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ প্রবিধানমালা ২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদিত ও স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির অগ্রাধিকার বা সাধারণ শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ইউনিট ফান্ড এবং ডিবেঞ্চারে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হারে মোট সম্পদের ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো। নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার বা সাধারণ শেয়ারে সম্পদের ২৫ শতাংশ, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ইউনিট ফান্ডে ২০ শতাংশ এবং ডিবেঞ্চারে সম্পদের ১০ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যাবে। তবে কোনোভাবেই ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা যাবে না। প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, জীবন বীমা কোম্পানিগুলো সম্পদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ‘এ’ ক্যাটাগরির তফসিলি ব্যাংকে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখতে পারবে। তবে শর্ত হলো- কোনো একটি ব্যাংকে গচ্ছিত স্থায়ী আমানত, চলতি আমানত, আংশিক স্থায়ী বা আংশিক চলতি আমানতের পরিমাণ সম্পদের ১০ শতাংশের বেশি হবে না।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৩৩৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged