দুই বন্ধ কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত নিরীক্ষক

সময়: বুধবার, নভেম্বর ২৭, ২০১৯ ৯:৪৮:২৩ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির অনিয়ম নিয়ে নিরীক্ষক আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে কোম্পানি দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত নিরীক্ষক। কোম্পানিগুলো হচ্ছে- জুট স্পিনার্স এবং খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড।
কোম্পানিগুলোর মধ্যে জুট স্পিনার্সের ভবিষ্যতে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম নিয়েও নিরীক্ষক আপত্তিকর মন্তব্য করেছে। নিরীক্ষক জানিয়েছে- ২০১৬ সালের জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে জুট স্পিনার্সের। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কোম্পানিটি ব্যবসা পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক। এছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কোম্পানির মালামালে তালিকা না থাকা, ব্যাংকের প্যাকিং ক্রেডিট লোনের তথ্য না পাওয়ায় সুদ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটজাত পণ্যের বাজার পরিস্থিতি ভালো না থাকায় ফের কারখানা চালু করলেও তা কতটুকু সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে তা নিয়ে নিরীক্ষকের সন্দেহ রয়েছে।
পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না। এ কারণে জুট স্পিনার্সের ব্যবসা অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পড়েছে। যা উদ্বেগের ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বহন করে। আর এ মুহূর্তে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা চালিয়েও যাচ্ছে। তাতে কর্তৃপক্ষ কতটুকু এগিয়ে যেতে পারবে তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
২০১৬ সালের জুন থেকে জুট স্পিনার্সের উৎপাদন বন্ধ। শুধু উৎপাদনই বন্ধ নয় আলোচ্য সময়ে কোম্পানির ব্যবসাসম্পর্কিত সব ধরনের কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। যদি কোম্পানিটির উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয় তাহলে কিছু নিয়ম পরিপালন করতে হবে। কোম্পানির উৎপাদন চালুর মুহূর্তে কি কি নিয়ম পরিপালন করতে হবে তা নিয়েও নিরীক্ষক মতামত জানিয়েছেন।
নিরীক্ষকের মতে, কোম্পানির উৎপাদন চালু করার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল একাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ন্ড-১৬ এর প্যারা ৩১ অনুযায়ী- কোম্পানির সম্পদ, প্লান্ট এবং যন্ত্রপাতি পুনমূল্যায়ন করতে হবে। ২০১৬ সালের জুন থেকে কারখানা বন্ধ রাখায় অবিক্রীত মালামাল রয়ে গেছে। তবে কারখানায় সম্পদ, প্লাট এবং যন্ত্রপাতির অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু কারখানা বন্ধের পর আলোচ্য জিনিসপত্রের কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। তা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে আইন অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এছাড়া কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি ৩০ মাসের বেশি সময় ধরে শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে না। বিষয়টি আইন অনুযায়ী কোম্পানিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে, কোম্পানিটির জনতা ব্যাংকের নিকট প্যাকিং ক্রেডিট লোন ছিল। এ লোনের আর্থিক হিসাব বিবরণী চাওয়া হলে ব্যাংক তা দেয়নি। কিন্তু ব্যালেন্সের ১৩ শতাংশ হারে সুদ চেয়েছে ব্যাংকটি। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, আমরা জনতা ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটা বা ইআরকিউ হিসাবের বিবরণী সংগ্রহ করতে পারিনি। ব্যাংক মৌখিকভাবে অবহিত করেছে যে, এসব তথ্য সরবরাহ করতে হলে অর্থ ঋণ আদালতের অনুমোদন লাগবে। তবে জনতা ব্যাংকের প্যাকিং ক্রেডিট লোনের সুদ দেয়া সম্ভব হয়নি। যা পরে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পাওনা কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
এর আগেও নিরীক্ষক কোম্পানির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল, ওই সময় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০০৬ সালের বাংলাদেশের শ্রম আইনের ২৩৪ (বি) ধারা পরিপালন করেনি। এছাড়া শ্রমিক ফান্ডের টাকার সুদ দেয়া হয়নি বলে নিরীক্ষক আপত্তি তুলেছিলেন।
ওই সময় কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন হলেও বাংলাদেশ হিসাব মান (বিএএস)-২৪ অনুযায়ী, তা প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছিল নিরীক্ষক। এছাড়া কোম্পানির পরিচালকদের সঙ্গে অধিকাংশ লেনদেন নগদে করায় নিরীক্ষক আপত্তি জানিয়েছেন। তবে এবার নিরীক্ষক জানিয়েছেন, গত দুই বছরে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও মোহাম্মদ শামস উজ জোহা ১ কোটি ৯২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৪১ টাকা কোম্পানির সংকট কাটিয়ে উঠার জন্য প্রতিষ্ঠানে দিয়েছে। এ অর্থের কোনো মুনাফা তিনি নেবেন না। কোম্পাটি সংকট কাটিয়ে উঠার পর এ অর্থ তাকে ফেরত দেয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে কোম্পানির পরিচালকরা নগদে লেনদেন করছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
পুঁজিবাজারে ১৯৮৪ সালে তালিকাভুক্ত ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ১৭ লাখ। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৩ দশমিক ২০ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার আছে। কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ২৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এদিকে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের নানা বিষয়ে অসঙ্গতি পেয়েছে নিরীক্ষক। আর এসব বিষয়ে নিরীক্ষক আপত্তি জানিয়েছেন। এর মধ্যে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির মজুদ পণ্যের হিসাব, কাঁচামালের হিসাবসহ বেশ কিছু অসঙ্গতি উল্লেখযোগ্য।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, নানা অনিয়মের খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড উৎপাদন বন্ধ থাকায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কোম্পানিটির। এছাড়া বেশ কয়েকবছর ধরে অপারেশনে না থাকা কোম্পানিটির মজুদ পণ্যের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। একইসঙ্গে মজুদ পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার যে হিসাব বিরবণী রয়েছে তাও ঠিকমতো হয়নি। একইসঙ্গে আলোচ্য সময়ে কোম্পানির কাঁচামালের অপব্যয় হয়েছে। যার ফলে কোম্পানিটির নিট লোকসান বেড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অবহেলায় ফেলে রাখা পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে কোম্পানির বেশ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। এসব কারণে নিরীক্ষক দুই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। পুঁজিবাজারে ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত ‘জেড’ ক্যাটাগরির খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৭৩ কোটি টাকা। কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা ৭ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৩৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার আছে।
দৈকিন শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৭০৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged