দেশের শেয়ারবাজার কখনোই ভালোভাবে চলেনি -খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সময়: রবিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯ ৯:৪৬:৫৮ পূর্বাহ্ণ


বিশিষ্ট ব্যাংকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন শেয়ারবাজার প্রতিদিনের ডেপুটি এডিটর এম এ খালেক।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন : দেশের শেয়ারবাজার যেভাবে চলছে আপনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? অর্থাৎ আমি জানতে চাইছি, শেয়ারবাজার বর্তমানে কেমন চলছে?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনকে ধন্যবাদ। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের শেয়ারবাজার কখনোই ভালো চলেনি বা চলছে না। আমরা ২০১০ সালে শেয়ারবাজার নিয়ে যে তদন্ত করেছিলাম, তাতে শেয়ারবাজারের দুর্নীতি আর অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছিল। আমি সেই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলাম। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার পর পুরো সিকিরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করা হয়েছিল। আমাদের প্রতিবেদনে আরো অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু সরকার সেসব পদক্ষেপ বা সুপারিশ বাস্তবায়ন করেননি। আমরা মনে করি, সরকারের এ অবহেলার কারণেই শেয়ার মার্কেট ঠিকমতো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। শেয়ারবাজার জনগণের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা স্মরণ করতে পারি সেই সময় যারা শেয়ার মার্কেটে ব্যবসায়ী ছিলেন, তাদের কয়েকজন সব পুঁজি, এমনকি ধার করা টাকা হারিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও অনেক সময় দেখা গেছে, মানুষ শেয়ারবাজারে ভীড় করছে। কারণ তাদের বিনিয়োগের তেমন কোনো উপযুক্ত জায়গা নেই। কিন্তু তারা শেয়ারবাজারের অবস্থা দেখে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে একসময় ফিরে গেছেন। এ অনিশ্চয়তার কারণে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ারবাজারের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। তারা বাজারের উপর সম্পূর্ণরূপে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বের সব শেয়ার বাজারেই অনিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু খুব কম বাজারই আছে যা আমাদের দেশের মতো অস্থিতিশীল।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন : আমাদের দেশে দেখা যায়, যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন তাদের বেশির ভাগই একেবারে অনভিজ্ঞ। এ অবস্থায় তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে মনে করেন? একজন বিনিয়োগকারীকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা দরকার বলে মনে করেন?
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : প্রশিক্ষণের বিষয়টি ভালো। কারণ যে কোনো কাজে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী বুঝতে পারবেন কোন ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করা ভালো বা অধিক লাভজনক হতে পারে। শেয়ারবাজারে সবসময়ই ঝুঁকি থাকে। তবে একজন বিনিয়োগকারী সতর্ক হলে বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে তিনি বুঝতে পারবেন কোন ধরনের শেয়ারে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম এবং লাভের সম্ভাবনা বেশি। কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি তাও তিনি অনুধাবন করতে পারবেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশিক্ষণ জরুরি হলেও সবচেয়ে বেশি জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শেয়ারবাজারকে দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে রক্ষার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। একটি কোটারি গোষ্ঠী মার্কেট পরিচালনা করছেন। তারা নিজেদের স্বার্থে মাঝেমধ্যে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা দেখে বিনিয়োগকারীরা বাজারে চলে আসে। সুযোগ বুঝে স্বার্থান্বেষী মহল বিনিয়োগকারীদের টাকা মেরে দিয়ে আবারো বাজারে শেয়ারের দাম কমিয়ে দেয়। এই কূটকৌশল বন্ধ করার জন্য জরুরিভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। আগে বাজার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। তারপর আসবে বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। অন্যথায় যত প্রশিক্ষণই দেয়া হোক না কেনো তাতে কাজ হবে না। এর মানে এই নয় যে, আমি প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে অস্বীকার করছি। কিন্তু আগে বাজারের অবস্থা ঠিক করতে হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে প্রায় আড়াই শত। এদের মধ্যে একটি কোটারি গ্রুপ গড়ে উঠেছে, যাকে আমরা সিন্ডিকেট বলি, তাদের একটি অংশ বাজার নিয়ে এক ধরনের খেলায় মত্ত রয়েছে। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো শেয়ারের দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। অবশ্য সদস্যদের সবাই এ কাজ করছে তা নয়। মুষ্ঠিমেয় কিছুসংখ্যক সদস্য এ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু তাদের সেই অপকর্মের দায়ভার বহন করতে পুরো শেয়ার মার্কেটকে। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। এ সমস্যার সমাধানের জন্য ডিএসই’র সদস্য পদপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং এজন্য একটি বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করতে যেতে পারে। তুলনামূলক স্বল্প টাকায় সদস্য পদপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমি জানি, যারা দায়িত্বে আছেন তারা সেটা করবেন না। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে সুপারিশ করবো এটা করার জন্য। শেয়ারবাজারকে রক্ষা করার জন্য ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন করা হয়েছিল। ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনের অর্থ হলো, যারা প্রশাসন চালাবেন তারা শেয়ার ব্যবসায়ে যুক্ত হতে পারবেন না। কিন্তু এটা কার্যকর হয়নি। শেয়ার ব্যবসায়ীরা আপত্তি করলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাদের সঙ্গে আপস করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহীত হলো, প্রতি ১০০ সদস্যের মধ্যে ৬০ জন এমন হবেন যারা শেয়ার ব্যবসা করেন না। আর অবশিষ্ট ৪০ জন শেয়ার ব্যবসায় যুক্তদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হতে পারবেন। যারা শেয়ার ব্যবসা করেন না এমন সদস্যের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত আমলা, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এ ধরনের ভালো লোক আছেন। কিন্তু তারা যেহেতু শেয়ার ব্যবসায়ী নন, তুলনামূলকভাবে ব্যবসা কম বুঝেন সেই কারণে তারা শেয়ারবাজারের দিকে ততটা মনোযোগ দেন না। এ সুযোগ অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ সদস্য, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে বা অন্য কোনো উপায়ে অবশিষ্টদের প্রভাবিত করে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছেন। মূলত সে কারণেই ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন কার্যকর হচ্ছে না। স্মরণ করা যেতে পারে, ড. মনোমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভারতের শেয়ারবাজারে যখন ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন হলো বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জসহ অনেক স্টক এক্সচেঞ্জ তাদের রাজি হয়নি। এ অবস্থায় ভারতে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করা হয়। তখন সব ব্যবসা চলে আসে সেখানে। তখন বাধ্য হয়ে বাইরের স্টক এক্সচেঞ্জগুলো ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন মেনে নেয়। আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনোমোহন সিং-এর মতো সৎ সাহস দেখাতে পারেননি বলেই শেয়ারবাজারের এই দুরবস্থা। বর্তমানে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রণে যে ৪০ শতাংশ ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদের হাত থেকে বাজার ব্যবস্থাপনাকে নিরপেক্ষদের নিকট নিয়ে আসতে হবে।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগের জন্য সবসময়ই পুঁজির অভাব থাকে। পুঁজি সঙ্কট কাটানোর জন্য তারা ব্যাংকের উপর নির্ভর করে। কিন্তু ব্যাংক অনেক সময়ই তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগণ চাহিদাকৃত পুঁজির জন্য শেয়ারবাজারের উপর কীভাবে নির্ভর করতে পারে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : পৃথিবীর সর্বত্রই শিল্প পুঁজি গঠন এবং সম্প্রসারণে পুঁজিবাজার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। শিল্প পুঁজি যোগান দেবার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সেক্টর তেমন একটা ভূমিকা রাখে না। কারণ ব্যাংকের নিজস্ব কোনো টাকা নেই। তারা জনগণের নিকট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। ব্যাংক জনগণের নিকট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ‘চাহিবা মাত্র’ তা ফেরৎ দেবার শর্তে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী আমানত সংগ্রহ করলেও তার মেয়াদ ২-৩ বছর বা তারও কিছু বেশিদিনের জন্য। কিন্তু শিল্পে যে পুঁজি ব্যবহৃত হয় তা দীর্ঘমেয়াদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে এটা ১০ বছর বা ১৫ বছরের জন্যও হতে পারে। ফলে ব্যাংকের সঙ্গে প্রায়শই মিসম্যাচ হয়ে থাকে। ব্যাংক প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিতে পারে। উন্নত দেশেগুলোতে উদ্যোক্তারা শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সাধারণত ব্যাংক থেকে গ্রহণ করে না। তারা শেয়ারবাজার থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু আমাদের মতো দেশে উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজনীয় শিল্প পুঁজির জন্য ব্যাংকের নিকট ধর্ণা দিয়ে থাকেন। যেহেতু দেশের শেয়ারবাজারের উপর তাদের আস্থা কম তাই তারা সেখান থেকে পুঁজি সংগ্রহের চেষ্টা করেন না। আমাদের দেশের শেয়ার মার্কেট এখনো শিল্পের পুঁজি যোগানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাই উদ্যোক্তারা সেখান থেকে পুঁজি সংগ্রহের চেষ্টা না করে ব্যাংকের উপর নির্ভর করছেন। একসময় সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল; কিন্তু শেষপর্যন্ত অজ্ঞাত কারণে সেগুলোকে বাজারে নিয়ে যায়নি। আমি মনে করি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমান্বয়ে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসা যেতে পারে।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৫৫৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged