এক দশকে বেড়েছে প্রায় চারগুণ

দেশে কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৬

সময়: রবিবার, নভেম্বর ৩, ২০১৯ ৯:১৮:০৩ পূর্বাহ্ণ


সোহেল রহমান : বর্তমানে দেশে কোটিপতির সংখ্যা পৌনে দুই লাখের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি পঞ্জিকা বছরের গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে ১ কোটি টাকার অধিক আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে আমানতকারীর সংখ্যা ৮০ হাজার ৩৯৬ জন এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৯৬ হাজার ৩৬০ জন। এটা হচ্ছে ‘রেকর্ডেড’ কোটিপতির সংখ্যা। তবে পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এর বাইরে ‘আন-রেকর্ডেড’ কোটিপতির সংখ্যা কতোÑ এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৯১ হাজার ১৬৫ জন। সর্বশেষ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুন ২০১৯) মোট কোটিপতির সংখ্য বেড়েছে ১০ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে আমানতকারী বেড়েছে ৪ হাজার ৮৩৩ জন এবং ঋণগ্রহীতা বেড়েছে ৫ হাজার ১৯৫ জন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে অর্থাৎ ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে কোটিপতির মোট সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯ জন (আমানতকারী ১৯,১৬৩ ও ঋণগ্রহীতা ২৫,২০৬)। আর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৮ জন। সে হিসাবে, গত এক দশকে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৩৫৯ জন। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চারগুণ। বছরে গড়ে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১২ হাজার ২৩৫ জন।
বর্তমান সরকারের প্রথম দফার মেয়াদ (২০০৯-২০১৩) শেষে ব্যাংক খাতে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৯৮ হাজার ৫৯১ জন (আমানতকারী ৪৯,৬৪০ ও ঋণগ্রহীতা ৪৮,৯৫১)। আলোচ্য সময়ে মোট কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫৪ হাজার ২২২ জন। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় দফার মেয়াদ (২০১৪-২০১৮) শেষে দেশের ব্যাংক খাতে কোটিপতির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৮ জন (আমানতকারী ৭৫,৫৬৩ ও ঋণগ্রহীতা ৯১,১৬৫)। এ সময়ে মোট কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৬৮ হাজার ১৩৭ জন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের আমলেই কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। প্রতিবার রাষ্ট্র ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এক শ্রেণির নব্য কোটিপতির উত্থান ঘটছে। একক বছর হিসাবে সবচেয়ে বেশি কোটিপতি বেড়েছে ২০১০ সালে। ওই বছর কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার ৮৯২ জন। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে কোটিপতি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা কোটিপতি আমানতকারীদের তুলনায় সব সময়েই বেশি। এর একমাত্র ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় ২০১৩ সালে। আলোচ্য বছরে কোটি টাকার অধিক ঋণগ্রহীতার চেয়ে আমানতকারীর সংখ্যা বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রমতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল তফসিলি ব্যাংকের কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাবের ভিত্তিতে যে প্রতিবেদন তৈরি করে সেটাই কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। তবে অবৈধ বিত্তের মালিকরা স্বনামে-বেনামে একাধিক একাউন্টে কিংবা নিজস্ব কোনো ব্যবস্থায় টাকা রাখতে পারেন। তাদের শনাক্ত করা কঠিন।
এদিকে দেশে বিপুলসংখ্যক কোটিপতির উত্থানের বিষয়টি স্বাভাবিক বলেই মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তার মতে, ‘ইট ইজ নট ব্যাড সাইন। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, শিল্পায়ন বেড়েছে। তবে কারা এসব বিত্তের মালিক হচ্ছেন এবং এর ফলে অসাম্য বাড়ছে কি নাÑ এসব নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।’
সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ-এর মতে, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেখা যাবে, আগামীতে যে সরকার আসবে, তখন এ সংখ্যা আরও বাড়বে এবং এটা বাড়তেই থাকবে, কমবে না।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে ধরনের অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, সেটা ছিল ‘ওয়েলফেয়ার ইকোনমি’। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর সেটা হয়ে গেছে ‘পুঁজিবাদী অর্থনীতি’। আর পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে টাকা কামানোটাই বড় কথা। লুটপাট, চুরি এগুলো কোনো বিষয় নয়। তবে আগে এগুলো অতটা ডাই-হার্ট ছিল না, এখন যতটা হয়েছে। তবে পুঁজি বিকাশের ফলে প্রচুর উন্নতি হয়েছে। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।’
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২৫৯ জন (আমানতকারী ৪৭ ও ঋণগ্রহীতা ২১২)।
জিয়া সরকারের আমলে (ডিসেম্বর ১৯৮০) এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫৪ জন (আমানতকারী ৯৮ ও ঋণগ্রহীতা ৩৫৬)।
এরশাদ সরকারের আমল শেষে (ডিসেম্বর ১৯৯০) দেশে কোটিপতির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৮ জন (আমানতকারী ৯৪৩ ও ঋণগ্রহীতা ২,১২৫)।
খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামল শেষে (জুন ১৯৯৬) কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ১২০ জন (আমানতকারী ২,৫৯৪ ও ঋণগ্রহীতা ৪,৫২৬)।
শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামল (জুন ১৯৯৬-সেপ্টেম্বর ২০০১) শেষে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৫৮২ জন (আমানতকারী ৫,১৬২ ও ঋণগ্রহীতা ৮,৪২০)।
দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৮৫৯ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged