মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন বন্ধ ৮ মাস

সময়: বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ ৮:৫৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ : চলতি বছরের আট মাস পেরিয়ে গেলেও মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ (বিএসইসি)। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় এ সময়ের মধ্যে মাত্র দু’টি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিদর্শন চালিয়েছে সংস্থাটি। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, কাজের স্বচ্ছতা যাচাই ও কমপ্ল্যায়েন্স পরিপালনের বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। তবে হাউসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন না হলে আইন পরিপালনে ঘাটতি, শেয়ার কারসাজি, মার্জিন ঋণ প্রদানে অনিয়ম ও পরিচালকদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বড় ধরনের ব্যত্যয় দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন না হলে এসব প্রতিষ্ঠানে আইন পরিপালনে ঘাটতি থেকে যায়। ব্যাক অফিসের সঙ্গে ‘সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড’ (সিডিবিএল)-এর শেয়ারে ঘাটতি তৈরি হয়। এতে কারসাজি চক্রের শেয়ার লেনদেন, মার্জিন ঋণ গ্রহণ, পরিচালকদের সুবিধা প্রদানে বড় ধরনের অনিয়ম তৈরি হয়। নিয়মিত পরিদর্শন করলে এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কমপ্ল্যায়েন্সের আওতায় চলে আসে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘ব্রোকারেজগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করা উচিত। বিশেষ করে, যেসব ব্যক্তি মালিকানার ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদেরকে নিয়মিত পরিদর্শন করে কমপ্ল্যায়েন্সের আওতায় আনা উচিত। পৃথিবীর কোথাও ব্যক্তি মালিকানায় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘এসব ব্যক্তি মালিকানার ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে অনিয়ম বেশি হয়। পরিচালকদের নানা সুবিধা প্রদান করা হয়। তাদের হিসাবে ব্যাক অফিসের সঙ্গে সিডিবিএলের শেয়ারে ঘাটতি তৈরি হয়। এসব হাউজগুলো খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’

বিষয়টি নিয়ে বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ব্রোকারেজ হাউসগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। এসব হাউজগুলো যাতে বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে সার্বিক সিকিউরিটিজ আইন মেনে চলে। তবে মার্কেট নেতিবাচক রয়েছে বলে ব্রোকারেজ হাউসগুলো নিয়মিত পরিদর্শন বন্ধ রয়েছে, এটা বলা ঠিক হবে না। কারণ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিতই পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিএসইসি।’

বিএসইসি সূত্র বলছে, বিএসইসি’র প্রতিনিধিরা ব্রোকারেজ হাউজগুলো নিয়মিত পরিদর্শন বাজারে একটা প্রভাব পড়ে। তবে নেতিবাচক মার্কেটে পরিদর্শন করলে তা বাজারের লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই নিয়মিত পরিদর্শনের পরিবর্তে অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ পরিদর্শন ও তদারকি আরো বাড়ানো হয়েছে।

বিএসইসি’র বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে ১৫টি। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৭টি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৯টি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালে মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়।

‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০’ ও ‘প্রবিধান ৩৬-এর ডিপোজিটরি (ব্যবহারিক) প্রবিধানমালা’ অনুসারে এসব প্রতিষ্ঠান বা অনুমোদিত প্রতিনিধিদের হিসাব বা তথ্য যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। বিএসইসি’র পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ও ব্যত্যয় পেলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানাও করা হয়।

মূলত বিএসইসি’র এসব প্রতিষ্ঠানে কমপ্ল্যায়েন্স তদারকিতে দুই ধরনের পরিদর্শন পদ্ধতি রয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে- কোনো ব্রোকারেজ হাউজ বা স্টক ডিলার বা মার্চেন্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন করা। এ ধরণের পরিদর্শনকে বিশেষ পরিদর্শন বলা হয়। আর অন্যটি হচ্ছে- কোনো অভিযোগ ছাড়াই কমিশন কর্তৃক যে কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ ও স্টক ডিলারের প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন।

এর মধ্যে নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় সাধারণত হাউজগুলোয় গ্রাহকদের সমন্বিত হিসাবে টাকা আছে কি-না, ব্রোকারেজ হাউজগুলো ‘সিডিবিএল’-এর ব্র্যাক অফিসের সঙ্গে শেয়ারের ঘাটতি আছে কি-না, নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে কি-না তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাছাড়া পরিদর্শনকালে ব্রোকারেজ হাউজের ওয়ার্কস্টেশনের নির্ধারিত জায়গা ও অনুমোদিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হয় কি-না তা যাচাই করা হয়। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকের পেমেন্টের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় গ্রাহকের নিকট থেকে নগদ গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হচ্ছে কি-না। এছাড়া নিবন্ধন ছাড়া কোনো হিসাবে লেনদেন হচ্ছে কি-না, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হালনাগাদ করা আছে কি-না। পাশাপাশি কোনো ব্রোকারেজ হাউজ তাদের পরিচালকদের নিয়মবহির্ভূত মার্জিন ঋণ দিয়েছে কি-না বা মার্জিন ঋণ বিতরণে সিকিউরিটিজ আইন পরিপালন করা হয়েছে কি-না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিদর্শনকালে কমিশনের প্রতিনিধি দল ব্রোকারেজ হাউজের সব হিসাব বই, রেজিস্টার প্রতিবেদন ও অন্য দলিলাদি পর্যালোচনা করেন।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৪০০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged