৯ মাসে প্রায় অর্ধেক দর হারিয়েছে ১০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

সময়: রবিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৯ ৯:০৭:০৮ পূর্বাহ্ণ


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যাপক দরপতন হয়েছে। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন সঞ্চতি ঘাটতি, অর্থ সংকটসহ নানা অনিয়মে এ খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির অবস্থা হুমকির মুখে। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে গত ৯ মাসে ৪৫ শতাংশের ওপরে দর কমেছে এ খাতের ১০ কোম্পানির শেয়ারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি দর কমেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড’ (আইএলএফএস) ও ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন’ (বিআইএফসি)-এর শেয়ারে। কোম্পানি দু’টি ৬৭ শতাংশের বেশি শেয়ার দর হারিয়েছে।
দেখা গেছে, গত ৯ মাসে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং শেয়ার দর হারিয়েছে ৬৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ, বিআইএফসি ৬৭ দশমিক ১০ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ৫৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ৫৭ দশমিক ০৩ শতাংশ, ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ৫৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ, পিপলস লিজিং ৫৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, মাইডাস ফাইন্যান্সিং ৫৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ফার্স্ট ফাইন্যান্স ৫১ দশমিক ৯৫ শতাংশ, আইপিডিসি ৫১ দশমিক ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে।
এছাড়া লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টে ৪৮ দশমিক ৬২ শতাংশ, বে লিজিংয়ে ৪৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, বিডি ফাইন্যান্সে ৪৫ দশমিক ০৯ শতাংশ, জিএসপি ফাইন্যান্সে ৪৪ দশমিক ৬১ শতাংশ, ফিনিক্স ফাইন্যান্সে ৪০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সে ৩৭ দশমিক ৯২ শতাংশ, আইডিএলসি ফাইন্যান্সে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, আইসিবিতে ৩৭ দশমিক ১৩ শতাংশ, প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং ন্যাশনাল হাউজিংয়ে ৩৫ দশমিক ০৭ শতাংশ শেয়ার দর কমেছে।
এদিকে সবচেয়ে কম ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারিয়েছে ‘ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং লিমিটেড’। এছাড়া ইসলামিক ফাইন্যান্সে ৩৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং উত্তরা ফাইন্যান্সে ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ শেয়ার দর কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের টানা দরপতনে এমনিতেই দিশেহারা হয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীরা। তাতে পিপল’স লিজিংয়ের দরপতনের কারণে চরম নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায় আর্থিক খাতের বিনিয়োগকারীরা। ফলে এ খাতে ধারাবাহিক দরপতন চলতে থাকে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি বেশিরভাগ সময়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে চলছে। এখানে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ ‘দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘এসব কোম্পানির মধ্যে ইতোমধ্যে একটি অবসায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে এমন দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায়। তারা খুব দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে অনেকেই অতীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; এখনো হচ্ছেন। এরা শুধু নামে তালিকাভুক্ত রয়েছে। ডিএসই এসব দুর্বল কোম্পানির সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করে তালিকাচ্যুতির মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
সবচেয়ে দর হারানো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর শেয়ার দর কমেছে ৬৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত ২০ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ১৬ টাকা ৯০ পয়সা। আর সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৫ টাকা ৫০ পয়সায়। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে কোম্পানিটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ৪৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৬৫ টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানিটি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫৩ টাকা। সেই হিসাবে খোলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ঘাটতি ২৫২ কোটি ৪৭ লাখ ৮৫ হাজার ৮১২ টাকা।
আর গত ২০ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরশেন’ (বিআইএফসি)-এর শেয়ার দর ছিল ৭ টাকা ৬০ পয়সা। আর সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২ টাকা ৫০ পয়সায়। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার কমেছে ৬৭ দশমিক ১০ শতাংশ। কোম্পানিটির মোট পুঞ্জিভূত লোকসানের পরিমাণ ৭৬৯ কোটি ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোন লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এ সময়ে কোম্পানির শেয়ার প্রতি লোকসান হয়েছে ১৩ টাকা ৫ পয়সা। শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৭৯ টাকা ৪৫ পয়সা (নেতিবাচক)।
একই সময়ে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার দর ছিল ৭ টাকা ৩০ পয়সা। আর সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩ টাকায়। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ৫৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সমাপ্ত হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় হয় ৮১ পয়সা। আর শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) হয় ৭ টাকা ২২ পয়সা। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ অনুযায়ী কোম্পানিটির স্বল্প মেয়াদে ঋণ রয়েছে ২০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ রয়েছে ১৬৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
এদিকে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের শেয়ার দর কমেছে ৫৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত ২০ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৬ টাকা ৬০ পয়সা। আর সর্বশেষ কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩ টাকায়। নানা অনিয়ম, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং চরম অর্থ সংকটের কারণে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারায় ইতোমধ্যে কোম্পানিটি বন্ধের জন্য অবসায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আর উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনও বন্ধ করা হয়েছে।
এছাড়া সমস্যায় জর্জরিত ফার্স্ট ফাইন্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারছে না। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ সমাপ্ত হিসাব বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৯৬ কোটি ১৯ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ ৫ হাজার ৬৮৫ টাকা। এর সঙ্গে আরও ২ কোটি অন্য সম্পদ মিলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির মোট বিক্রিত সম্পদের পরিমাণ ৮৭৯ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৭৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৯৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯০ টাকা।

দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিন/এসএ/খান

Share
নিউজটি ৩৫১ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged