আইপিওতে ডিসকাউন্টের যুগ শেষ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিরল লটারি

সময়: সোমবার, জানুয়ারি ৫, ২০২৬ ১২:২০:০৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’ জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন এই বিধিমালার মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য কেবল আর্থিকভাবে শক্ত ভিত্তির কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা। একই সঙ্গে আইপিও থেকে উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন নিয়মে আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ঋণ পরিশোধ বা বিনিয়োগ খাতে ব্যয় করা যাবে। তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঋণ অবশ্যই কোম্পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন, যন্ত্রপাতি ক্রয় কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হতে হবে এবং তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—খেলাপি বা রিশিডিউল করা কোনো ঋণ আইপিওর অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের বিধিমালায় ঋণের ধরন নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকলেও নতুন বিধিতে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

ইউসিবি ইনভেস্টমেন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন এই বিধিমালা আইপিওর মূল্য নির্ধারণ, শেয়ার বরাদ্দ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। ফিক্সড-প্রাইস পদ্ধতিতে এখন থেকে প্রিমিয়ামসহ আইপিও আনা যাবে, তবে এর জন্য কোম্পানিকে টানা দুই বছর নিট মুনাফা অর্জন, পজিটিভ ক্যাশ ফ্লো এবং অন্তত তিন বছরের বাণিজ্যিক উৎপাদনের রেকর্ড থাকতে হবে। পাশাপাশি বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইএমইআই নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এসেছে বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে ডিসকাউন্ট সুবিধা বাতিলের মাধ্যমে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক, সাধারণ ও অনিবাসী—সব ধরনের বিনিয়োগকারীকে একই ‘কাট-অফ প্রাইসে’ শেয়ার কিনতে হবে। বিএসইসির মতে, আগের ডিসকাউন্ট ব্যবস্থা বাজারে কৃত্রিম মূল্য অস্থিরতা সৃষ্টি করত। একই সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে আবারও লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা শেয়ার বরাদ্দে হতাশা কমাবে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াবে।

নতুন বিধিমালায় আইপিওর আকার সম্পর্কেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোনো কোম্পানির আইপিও-পূর্ব পরিশোধিত মূলধন ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা এবং আইপিও-পরবর্তী মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হতে হবে। গ্রিনফিল্ড বা নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে; কোম্পানি মুনাফায় না আসা পর্যন্ত তারা দুই বছরের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। এছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে ‘গেটকিপার’ হিসেবে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা প্রসপেক্টাস যাচাই ও কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য চালু করা হয়েছে লক-ইন পিরিয়ড, যেখানে বরাদ্দ পাওয়া শেয়ার ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত বিক্রি করা যাবে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই বিধিমালার ফলে স্বল্পমেয়াদে আইপিওর সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি শেয়ারবাজারের গুণগত মান উন্নত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০২৫ সালের এই বিধিমালাকে বাংলাদেশের আইপিও বাজারে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share
নিউজটি ৩৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged