নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেওয়া বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ঋণ ঘিরে দীর্ঘদিনের গুরুতর অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। পর্যাপ্ত যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা কার্যকর তদারকি ছাড়াই প্রায় দেড় দশক ধরে ধাপে ধাপে ঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছে। খেলাপি অবস্থায় পৌঁছানোর পরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ঋণটিকে কৌশলে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য বিশ্লেষণে এসব অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে আনন্দ শিপইয়ার্ডকে প্রথম দফায় ৫১ কোটি ৪ লাখ টাকার নন-ফান্ডেড বিনিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে ২০০৭ সালে সেই সীমা বাড়িয়ে ৪৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়, যার বড় অংশ ছিল রিফান্ড গ্যারান্টি। একই বছরের মধ্যেই আরেক দফা সংশোধনের মাধ্যমে বিনিয়োগসীমা দাঁড়ায় ৫৪৮ কোটি ১ লাখ টাকায়, পাশাপাশি যোগ করা হয় ২৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন সুবিধা।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা জামানতের মান যথাযথভাবে যাচাই না করেই এসব অনুমোদন দেওয়া হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু নাসের মুহাম্মদ আব্দুজ জাহের এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফারিদুদ্দিন আহমেদ–এর সময়েই এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এমনকি ২০০৮ সালে কোনো প্রকল্প মূল্যায়ন ছাড়াই একই বিনিয়োগ সীমার আওতায় আরও চারটি জাহাজ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, বিদেশি ক্রেতাদের অনুকূলে ইস্যু করা রিফান্ড গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর গাফিলতি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৪২ দিন আগে নবায়নের কথা থাকলেও ব্যাংক তা করেনি। ফলে জার্মান ক্রেতারা গ্যারান্টি দাবি করলে ইসলামী ব্যাংককে ১১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী এই অর্থ গ্রাহকের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ হিসেবে দেখানোর কথা থাকলেও ব্যাংক তা দীর্ঘমেয়াদি এইচপিএসএম হিসাবে স্থানান্তর করে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই পদক্ষেপকে গুরুতর বিধিলঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে গ্রাহক টঙ্গীতে হেলিপ্যাডসহ একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেন, যা ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত হিসেবে দেখানো হয়নি।
আন্তর্জাতিকভাবে জাহাজ নির্মাণ খাতে যেখানে ঋণের অন্তত দ্বিগুণ মূল্যের জামানত নেওয়ার রীতি রয়েছে, সেখানে ইসলামী ব্যাংক ৫৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র ১০ কোটি টাকার জামানত গ্রহণ করে। ব্যাংকের সর্বশেষ নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী বর্তমানে ওই জামানতের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭১ কোটি টাকা।
সাধারণভাবে কিস্তি পরিশোধে সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হলেও আনন্দ শিপইয়ার্ডকে দেওয়া হয় নজিরবিহীন ৬০ মাসের সময়সীমা। এর মাধ্যমে বছরের পর বছর ঋণটিকে ‘নিয়মিত’ দেখানো হয়েছে, যা ব্যাংকিং পরিভাষায় ‘এভারগ্রিনিং’ নামে পরিচিত।
ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ইসলামী ব্যাংক ২০১৫ সালে গ্রাহকের বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা দায়ের করলেও পরবর্তীতে ব্যাংক নিজেই একাধিকবার মামলাটি স্থগিত রাখতে সহযোগিতা করে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আনন্দ শিপইয়ার্ডের কাছে ইসলামী ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে মূল বিনিয়োগ ঋণের পরিমাণ ৪২৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, এই ঋণ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংক প্রায় সব প্রযোজ্য আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেছে।


