নিজস্ব প্রতিবেদক: তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেডের শেয়ারে অস্বাভাবিক দামের উত্থান এবং ডাটা সেন্টার বিক্রির সিদ্ধান্তের পেছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে তদন্তে নামছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সম্প্রতি এ বিষয়ে বিএসইসি দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. গোলাম কিবরিয়া এবং সহকারী পরিচালক মো. মোসাব্বির আল আশিক। কমিটিকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেড তাদের ডাটা সেন্টার ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আমরা হোল্ডিংস’-এর কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত জানায়। কোম্পানির ভাষ্যমতে, এ বিক্রি থেকে তারা ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার মুনাফা অর্জন করবে, যা তাদের আর্থিক বিবরণীতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই ঘোষণার এক বছরের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৩৬ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮২ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় শেয়ারের দাম, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে কারসাজিমূলক আচরণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এই কারণেই বিএসইসি শেয়ার দামের অস্বাভাবিক উত্থান ও সম্পদ বিক্রির নেপথ্য উদ্দেশ্য খুঁজে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।
ডাটা সেন্টার বিক্রির পর ২০২৪ সালে আমরা নেটওয়ার্ক ২০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩০ টাকায় ১:২ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে। এই মাধ্যমে তারা বাজার থেকে ৯২ কোটি ৯৭ লাখ ৯৯ হাজার ১২০ টাকা উত্তোলন করে। তবে রাইট শেয়ার ইস্যুর পরই কোম্পানির মুনাফা কমে আসে এবং শেয়ারের দাম আবার ১৮ টাকার নিচে নেমে যায়।
আমরা নেটওয়ার্কের আইপিওতে উল্লেখ করা হয়েছিল ডাটা সেন্টার স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধে সংগ্রহ করা অর্থ ব্যয় করার কথা। কিন্তু পাঁচ বছরেও ডাটা সেন্টার থেকে কোনও উল্লেখযোগ্য মুনাফা করতে না পেরে তা বিক্রি করে দেয় কোম্পানিটি। যেখানে ডাটা সেন্টারের বুক ভ্যালু ছিল ৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, সেখানে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করায় মুনাফা দেখালেও, বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য তা তেমন লাভজনক হয়নি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (EPS) ছিল ২ টাকা ৪৬ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (NAV) দাঁড়ায় ৩৭ টাকা ০১ পয়সায়। এই ভিত্তিতে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বিতরণ করতে ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি। ফলে ডিএসইর নিয়ম অনুযায়ী আমরা নেটওয়ার্ককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ৯ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯১২টি। সর্বশেষ ৩১ মে, ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো হলো:
উদ্যোক্তা ও পরিচালকগণের হাতে – ৩৩.০৪%
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে – ২১.৭১%
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে – ৪৫.২৫%
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে বাজারে আস্থা ফেরাতে বিএসইসির এমন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে একটি কোম্পানি সম্পদ বিক্রি করে রাইট শেয়ার ইস্যু করছে, অথচ বিনিয়োগকারীরা সে অনুযায়ী লাভ পাচ্ছেন না—সেই প্রেক্ষাপটে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর তদন্ত অপরিহার্য।


