নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অডিটরদের দেওয়া ‘গোয়িং কনসার্ন’ সতর্কবার্তার আওতায় এসেছে ৩৭টি কোম্পানি, যা তাদের ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, এ সংখ্যা মোট তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে বিষয়টি বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিলে অডিট প্রতিবেদনে ‘গোয়িং কনসার্ন’ সতর্কতা উল্লেখ করা হয়। ধারাবাহিক লোকসান, ঋণের ভার, তারল্য সংকট কিংবা উৎপাদন ব্যাহত হওয়া—এসব কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এই তালিকায় বিভিন্ন খাতের পরিচিত কোম্পানির নাম রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের বারাকা পাওয়ার ও ডরিন পাওয়ার, খাদ্য খাতের বিডি থাই ফুডসহ বস্ত্র, ওষুধ এবং আর্থিক খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিশেষ করে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের কয়েকটি কোম্পানি গুরুতর সংকটে রয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তীব্র তারল্য ঘাটতি এবং নেতিবাচক আয় পরিস্থিতি তাদের টিকে থাকার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ৩৭টি কোম্পানির মধ্যে ৯টি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই আয় করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো আর্থিক তথ্য প্রকাশেও অনিয়ম করছে, ফলে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে শেয়ারহোল্ডাররা পরিষ্কার ধারণা পাচ্ছেন না।
অডিট রিপোর্টে কিছু কোম্পানির দুরবস্থা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। যেমন, ইন্ডো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে এবং তারল্য সংকটে ভুগছে। সাফকো স্পিনিংস বিপুল লোকসানের পাশাপাশি ১৪০ কোটির বেশি ব্যাংক ঋণের বোঝা বহন করছে, যার কার্যক্রম প্রায় স্থবির এবং সম্পদ কম মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বারাকা পাওয়ারের একটি প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে, কারণ বিপিডিবির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন চুক্তি না হলে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে। অন্যদিকে, ডরিন পাওয়ার কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি শেষ হলেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ডের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম চালানোর সম্ভাবনা রাখছে।
আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। প্রাইম ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মতো কোম্পানিগুলো মারাত্মক তারল্য সংকট, ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি এবং নেতিবাচক আয়ের কারণে দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্ষেত্রেও অডিটররা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান ৭০০ কোটির বেশি এবং চলতি সম্পদের ঘাটতি ও উচ্চ ঋণের কারণে এর টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া আরও ২৩টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ রেখে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০টি কোম্পানি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্বচ্ছ অবস্থায় রয়েছে, যা প্রায় ৩৬০টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শেয়ারবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমিত কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি এ সংকটের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তারা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে নজরদারি জোরদার, তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন অকার্যকর বা অনিয়মকারী কোম্পানিগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ।


