ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আর লুটপাট নয়, কঠোর বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

সময়: রবিবার, জানুয়ারি ১১, ২০২৬ ৮:২২:৩৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকিং কোনো ধর্মীয় আবেগনির্ভর ব্যবস্থা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো। সঠিক নীতিমালা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাতে ভবিষ্যতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং কনফারেন্স’-এর দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনটির আয়োজন করে সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ।

গভর্নর জানান, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও সেই অনুপাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ক্ষেত্র না থাকায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং খাতটিকে স্থিতিশীল করতে একটি শক্তিশালী শরীয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক মার্কেট গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, কার্যকর সুকুক বাজার চালু হলে একদিকে সরকারের অর্থায়নের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটিয়ে পুরো খাত স্বস্তি পাবে।

তাত্ত্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংকিংকে সবচেয়ে নিরাপদ ঋণ ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকায় এ ব্যবস্থায় ঝুঁকি তুলনামূলক কম হওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলদারিত্বের কারণে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থার জন্য তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, শরীয়াহ বোর্ড এবং আমানতকারী—সব পক্ষকেই দায়ী করেন। বিশেষ করে আমানতকারীরা তাদের অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে আগে তেমন প্রশ্ন তোলেননি বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর।

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে সম্প্রতি নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যারা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে একটি নতুন ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলেও জানান তিনি।

শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদের উদ্দেশে গভর্নর বলেন, তাদের আরও দৃঢ় ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং চাকরির ভয়ে কোনো অনিয়মের সঙ্গে আপস করা চলবে না। তিনি বেক্সিমকো সুকুক বন্ড–সংক্রান্ত তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, জোরপূর্বক বন্ড বিক্রির কারণে এই বাজারে মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সরকার এখন নতুন করে একটি পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য সুকুক বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

সবশেষে কঠোর বার্তা দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশে আর কোনো ধরনের আর্থিক লুটপাটের সুযোগ দেওয়া হবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।

Share
নিউজটি ৫ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged