এনএভি কমে, ডিভিডেন্ড হোঁচট—মিউচুয়াল ফান্ড খাত চরম অনিশ্চয়তায়

সময়: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২, ২০২৫ ১১:২৩:১২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাত দীর্ঘমেয়াদী ও গভীর সংকটে নিমজ্জিত। বছরের পর বছর ইউনিট হোল্ডাররা প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ায় এই সেক্টরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অব্যবস্থাপনা, সম্ভাব্য তহবিল অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রকের দুর্বল নজরদারির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোতে যেখানে মিউচুয়াল ফান্ড পরিবারিক দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত, সেখানে বাংলাদেশের ইউনিট হোল্ডাররা ধারাবাহিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার বোঝা বহন করছেন। বছরের পর বছর ন্যূনতম রিটার্ন, ভুল নীতি, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবে এই খাত নিরাপদ বিনিয়োগের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীরা রিটার্নের আশা ছেড়ে দেওয়ায় মিউচুয়াল ফান্ড খাত দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অনেক অ্যাসেট ম্যানেজার নিয়ম ভেঙে নিজেদের স্বার্থে অ-তালিকাভুক্ত ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করছেন, যার খেসারত গুনছেন ইউনিট হোল্ডাররা। তারা মনে করেন, শক্ত তদারকির অভাবেই এ ধরনের অনিয়ম জেঁকে বসেছে।

বর্তমানে মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের আয়তন ৪ হাজার ৮১০ কোটি এবং ওপেন-এন্ড ফান্ডের ৫ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। বাজারে তালিকাভুক্ত ৩৭টি ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মধ্যে ৩৫টি এনএভির নিচে এবং ৩৩টি ফেস ভ্যালুর নিচে লেনদেন হচ্ছে। ২০২৪–২০২৫ সময়ে প্রতিটি ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের দর ৩০% থেকে ১৫০% পর্যন্ত নিম্নমুখী হয়েছে। ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদের বাজারমূলধন নেমেছে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকায়। বেশিরভাগ ফান্ডই বহু বছর ধরে প্রত্যাশিত ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না।

পেশাদার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীল রিটার্ন প্রত্যাশাকারী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন কমে যাওয়া এনএভি, দুর্বল ডিভিডেন্ড রেকর্ড ও অনিয়মের ঘটনায় নিরুৎসাহিত। কিন্তু লোকসান সত্ত্বেও অ্যাসেট ম্যানেজাররা নিয়মিত ফি আদায় করছেন। বাংলাদেশের সম্পদ-ব্যবস্থাপনা থেকে জিডিপি অনুপাত মাত্র ০.১৭%—যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। ভারতের অনুপাত ১৬.২%, ভিয়েতনামে ৬.৩% এবং পাকিস্তানে ১.৭%।

বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণের হারও অত্যন্ত কম—মাত্র ১%। মালয়েশিয়ায় এ হার ৯%, থাইল্যান্ডে ৮%, ভিয়েতনামে ৬.৬% এবং ভারতে ২.১% (তথ্য: গ্রিন ডেল্টা ড্রাগন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বৈষম্য প্রমাণ করে যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কতটা দুর্বল।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর মতে, বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদী লাভের প্রতি বেশি আগ্রহী। বহু বছর ধরে রিটার্ন কম থাকায় তারা মিউচুয়াল ফান্ডে আকর্ষণ হারিয়েছেন। তার মন্তব্য, অ্যাসেট ম্যানেজারদের দক্ষতার ঘাটতি ও দীর্ঘস্থায়ী বাজার অস্থিরতা ইউনিট হোল্ডারদের নিয়মিত রিটার্নের পথে প্রধান বাধা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পে অনিয়ম এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই খাত প্রায় ২৫ বছর পিছিয়ে পড়েছে। যতদিন অতীতের অনিয়মের বিচার ও সমাধান না হবে, ততদিন বিনিয়োগকারীরা আস্থায় ফিরবেন না। কাঠামোগত দুর্বলতা—যেমন আর্থিক অজ্ঞতা, কঠোর বিনিয়োগনীতি, ভালো কোম্পানির অভাব এবং দুর্বল প্রচারণা—সংকট আরও বাড়িয়েছে।

২০১৮ সালে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় বড় আঘাত দেয়। পাশাপাশি অব্যবস্থাপনাও গভীর সংকট তৈরি করেছে। একাধিক অ্যাসেট ম্যানেজার অ-তালিকাভুক্ত বা দুর্বল প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দামে বড় বিনিয়োগ করেছে।
যেমন—

আরএসিই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (যারা ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের ৪৮.০২% সম্পদ পরিচালনা করে) বিনিয়োগ করেছে মাল্টি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড সার্ভিসেস, পদ্মা ব্যাংক এবং রিজেন্ট স্পিনিং মিলসের বন্ডে।

এলআর গ্লোবাল (১৬.২১% সম্পদ) বিনিয়োগ করেছে এনার্জিপ্যাক প্রিমা, ইউনিকর্ন ইন্ডাস্ট্রিজ এবং পদ্মা প্রিন্টার্স (বর্তমানে কোয়েস্ট বিডিসি)–এ।

এসব বিনিয়োগ ইউনিট হোল্ডারদের কোনো কার্যকর রিটার্ন দেয়নি, অথচ ট্রাস্টিরা নজরদারিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এ ছাড়া ইউএফএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও অ্যালায়েন্স ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ তহবিল উদ্ধার এখনো হয়নি। দেশের ছোট বাজারে ৫৮টি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থাকায় প্রতিযোগিতা অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে—ভারতের বড় বাজারে যেখানে সংখ্যা মাত্র ৪৪।

বাজারে দীর্ঘস্থায়ী চাপও অবস্থাকে জটিল করছে। সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৮৬৩ পয়েন্ট। মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বড় অ-স্বীকৃত ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং ডিভিডেন্ড দেওয়ার আগে পুরো প্রভিশন বজায় রাখতে বাধ্য—যা রিটার্ন বিতরণ সীমিত করে।

এদিকে অক্টোবর মাসে বিএসইসি এলআর গ্লোবালের ৬টি ফান্ডের লেনদেন স্থগিত করে, কারণ পদ্মা প্রিন্টার্স নামের একটি অকার্যকর ওটিসি কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৬৯ কোটি টাকার অপব্যবহার ধরা পড়ে। এরপর ১৩ নভেম্বর ‘মিউচুয়াল ফান্ড রেগুলেশনস ২০২৫’ জারি করা হয়—যেখানে নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ড নিষিদ্ধ, বিদ্যমান ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় বাজারদর ধরে রাখতে ব্যর্থ ফান্ডগুলোকে ওপেন-এন্ডে রূপান্তর বা অবসায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১৮৮০ সালে আইসিবি প্রথম ফান্ড দিয়ে বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড যাত্রা শুরু হলেও বছরের পর বছর আস্থা ও স্বচ্ছতার সংকট কাটিয়ে ওঠা এখন দীর্ঘ পথের চ্যালেঞ্জ।

Share
নিউজটি ৬০ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged