নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতের ৯টি দুর্বল কোম্পানিকে অচল বা ‘নন-ভিয়েবল’ ঘোষণার ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে মঙ্গলবার (০৬ জানুয়ারি) লেনদেন শুরুর পর থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রয়চাপ দেখা যায়। ফলে আর্থিক খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর দিনভর সর্বনিম্ন সীমা বা সার্কিট ব্রেকারে নেমে আসে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সম্প্রতি একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মতো এখানেও শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ মূল্য শূন্য করে দেওয়া হতে পারে। এই ভয়ের কারণেই আর্থিক খাতের শেয়ারে একযোগে বিক্রির চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অচল বা ‘নন-ভিয়েবল’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হলো— পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস (ফাস) ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স।
গভর্নরের এ বক্তব্যের পরই বিনিয়োগকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। তবে ক্রেতার অভাবে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে আটকা পড়ে যান, যা বাজারে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
উপলব্ধ তথ্যে দেখা যায়, অচল ঘোষণার পথে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পুঞ্জীভূত লোকসান ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। পিপলস লিজিংয়ের মোট লোকসান ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১০০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল সুশাসন, অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন পুরোপুরি ক্ষয় হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাজারে আতঙ্ক আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতার কারণে। এর আগে পাঁচটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের সময় সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের ফেসভ্যালু শূন্য করে দেওয়া হয়েছিল। এনবিএফআই খাতের বিনিয়োগকারীরা এখন একই ধরনের পরিণতির আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, পবিত্র রমজানের মধ্যেই সাধারণ আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর আওতায় এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ বা অবসায়ন করা হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নিলেও শেয়ারহোল্ডারদের দায় এড়িয়ে চলায় শেয়ারবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগছে। এর প্রভাব হিসেবে নির্ধারিত ৯টি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আর্থিক খাতের অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারেও বিক্রির চাপ দেখা গেছে। খাতভুক্ত ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মঙ্গলবার লেনদেন হওয়া ২০টির শেয়ার দরই কমেছে।


