নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বড় অংশ এখনো নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বাধ্যতামূলক বিধান মানেনি। এই পরিস্থিতিতে নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাজধানীতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইনস্টিটিউট (আইক্যাব) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিএসইসি কমিশনার ফারজানা লালারুখ জানান, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৩৮টি কোম্পানি নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে। কমিশন সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুযোগ দিলেও এখনো বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এই বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল জারি করা গেজেট অনুযায়ী প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরবর্তীতে সময় বাড়ানো হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
করপোরেট গভর্নেন্সের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বিএসইসি কমিশনার বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নিয়ম অনুযায়ী কোম্পানি সেক্রেটারি নিয়োগ নেই। কোথাও কোথাও সিএফওকে সেক্রেটারি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অননুমোদিত ও বিধিবহির্ভূত।
ফারজানা লালারুখ বলেন, “অননুমতি মানা কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাকবেঞ্চারের মতো আচরণ করছে। বিএসইসি এখন আর বেবিসিটার নয়, আমরা প্রকৃত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকতে চাই।” তিনি সতর্ক করে জানান, নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে কমিশন আর ছাড় দেবে না।
আইক্যাব ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) যৌথভাবে আয়োজিত ‘অ্যাডভান্সিং ইনক্লুসিভ গভর্নেন্স – ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টরশিপ’ শীর্ষক বৈঠকে আইক্যাব সভাপতি এনকে এ মোবিন, এফসিএ সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইক্যাবের জেন্ডার ইনক্লুশন অ্যান্ড লিডারশিপ কমিটির চেয়ারম্যান জেরিন মাহমুদ হোসেন, এফসিএ।
বিএসইসি কমিশনার আরও বলেন, দেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো নারীর নেতৃত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার কারণে অনেক বোর্ডে নারীর উপস্থিতি সীমিত থাকে। পারিবারিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগও অনেক সময় সংকুচিত হয়। দুর্বল কমপ্লায়েন্স ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে গভর্নেন্স কাঠামো শক্তিশালী, সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালকরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তিনি জানান, বিএসইসি যোগ্য নারী স্বতন্ত্র পরিচালকদের একটি শক্তিশালী ডাটাবেজ বা পুল গড়ে তুলছে। ভবিষ্যতে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লে নিয়োগের কিছু শর্ত শিথিল করার বিষয়েও কমিশন ভাবছে।
বৈঠকে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে বিএসইসির অনুমোদন পেতে অনেক সময় দেরি হয়। এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নমনীয় করার প্রয়োজন রয়েছে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মানজুর বলেন, স্বতন্ত্র পরিচালকরা ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বোর্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা দুটোই বৃদ্ধি পায়। তার মতে, বোর্ডকে ক্ষমতায়িত করা গেলে ভালো গভর্নেন্সের পাশাপাশি মুনাফাও বাড়ে।
আইক্যাব সভাপতি এনকে এ মোবিন বলেন, অডিট কমিটিতে কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক তিন মেয়াদ শেষে চেয়ারম্যান হতে না পারার বিধান পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে প্রতিটি বোর্ডে অন্তত একজন ফাইন্যান্স বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট–যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালক থাকা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ESG রিপোর্টিংসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেক পরিচালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, নারী স্বতন্ত্র পরিচালক বোর্ডে ভারসাম্য ও বৈচিত্র্য আনে। তবে বিএসইসির অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাহিদা অনেক সময় নিয়োগ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। তাই সব পরিচালকের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার ওপর তিনি জোর দেন।
আইসিএসবির সভাপতি হোসেন সাদাত বলেন, পরিচালক নিয়োগ অবশ্যই পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে হতে হবে। রাজনৈতিক বা পারিবারিক প্রভাবের সুযোগ রাখা উচিত নয়। AGM-এ স্বতন্ত্র পরিচালকদের মতামত প্রকাশের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ইকনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আখতার মালা বলেন, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বর্তমান যোগ্যতার শর্ত কিছুটা কঠোর। শর্ত সহজ হলে অংশগ্রহণ বাড়বে। একই সঙ্গে তিনি বোর্ডে নারী-পুরুষের ৫০:৫০ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ফারজানা চৌধুরী বলেন, পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেক নারী বাস্তব নেতৃত্বে দক্ষ হলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি থাকে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগে বিশেষ বিবেচনা থাকা উচিত বলে তিনি মত দেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি)-এর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, অনেক কোম্পানি নিয়ম মানতে আগ্রহী হলেও বাস্তব প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার মুখে পড়ে। যোগ্য নারী প্রার্থী পাওয়া গেলেও অনেকেই দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী থাকেন, আবার কেউ দায়িত্ব নিলেও সব শর্ত পূরণে সমস্যা হয়। শর্ত কিছুটা শিথিল হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নিয়ম মানা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
আইএফসির ইএসজি কর্মকর্তা লোপা রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে—বোর্ডে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়ে, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও গভর্নেন্স তত শক্তিশালী হয়।
আইক্যাবের জিএইচএলসি সদস্য সাংজিদা কাসেম জানান, তাদের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে ২১ জন নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নয়টি খাতের বিভিন্ন বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া আরও ১৩৪ জন নারী এফসিএ স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছেন। আইক্যাব নারী নেতৃত্ব তৈরিতে একটি শক্তিশালী পাইপলাইনও গড়ে তুলেছে।
আইক্যাব ও আইএফসি মনে করে, বোর্ডে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি শুধু বিধান মানার বিষয় নয়; এটি শক্তিশালী গভর্নেন্স নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠন এবং করপোরেট খাতের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।


