খেলাপি ঋণে চাপ বাড়লেও ব্যতিক্রম ১৭ ব্যাংক

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ১১:৫০:৫৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি যখন ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে, তখনও ১৭টি বেসরকারি ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে ধরে রাখতে পেরেছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার যেখানে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, সেখানে এসব ব্যাংকের তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্সকে ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫২টি স্থানীয় ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলো হলো— সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক এবং সিটিজেনস ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ এড়িয়ে চলা, গ্রাহক যাচাইয়ে কঠোরতা, নিয়মিত ঋণ আদায় এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার কারণেই এসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। পাশাপাশি সুশাসন ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তারা জানান, অনেক ব্যাংক দ্রুত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বড় অঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে জড়ালেও এসব ব্যাংক ধীরগতিতে হলেও টেকসই ব্যবসা মডেলে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে নতুন কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ছোট ঋণ পোর্টফোলিও থাকায় খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কম ছিল। বিপরীতে, পুরনো অনেক ব্যাংক এখনও অতীতের বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা বহন করছে।

১৭টি ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে কম সিটিজেনস ব্যাংকে, যা মাত্র ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আর এই তালিকায় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার রয়েছে যমুনা ব্যাংকের, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন জানান, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা খাতের গড় হারের তুলনায় অনেক কম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই হার আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে নামবে।

তার মতে, শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সুশাসন কাঠামোই এই অগ্রগতির মূল ভিত্তি। সিটি ব্যাংকে ঋণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ পেশাদারভাবে নেওয়া হয় এবং বোর্ড কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। পাশাপাশি ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আলাদা কাঠামোয় পরিচালিত হয়।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলি রেজা ইফতেখার জানান, গত ৩৩ বছর ধরেই তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ অনুমোদনের আগেই গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা কঠোরভাবে যাচাই করা হয় এবং বিতরণের পর নিয়মিত নজরদারি চালানো হয়।

তিনি আরও জানান, ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকটিতে একাধিক টিম কাজ করে। ১ থেকে ৩০ দিন বিলম্বিত ঋণের জন্য একটি টিম দায়িত্ব পালন করে, বিলম্ব বাড়লে অন্য টিম দায়িত্ব নেয়। পাশাপাশি একটি আলাদা আইনি টিমও সক্রিয় রয়েছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাইম ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণ ছিল ৩২ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ১ শতাংশ।

প্রাইম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান ও. রশিদ বলেন, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রস্তাব কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। পাশাপাশি ঋণ বিতরণের পর ব্যবসার পারফরম্যান্স নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাত এড়িয়ে চলা হয়।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ব্যাংকটির বোর্ডে আটজন পরিচালক রয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজনই স্বাধীন পরিচালক। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত এই বোর্ড সুশাসন নিশ্চিত করছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানান, ব্যাংকের মালিকপক্ষ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। বোর্ড নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকে এবং ব্যবস্থাপনা দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তিনি বলেন, ঋণ আদায়ে ব্যাংকের রিকভারি বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়, যা আদায় প্রক্রিয়াকে সহজ করে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণ বিতরণে সব নীতিমালা ও প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। কোনো ধরনের সুপারিশ বা চাপের মুখে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয় না।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বিভাগ আলাদাভাবে নথিপত্র যাচাই করে এবং বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত মেনে নেয় না। এই স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলাই ব্যাংকটিকে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করেছে।

 

Share
নিউজটি ৬৮ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged