নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কারসাজিকারী খেলোয়াড়দের দাপট এতটাই বেড়েছে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছে—এমন মন্তব্য করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ডিভিডেন্ড মৌসুমেও বাজারে স্বাভাবিক গতি ফিরছে না, বরং টানা দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভীষণভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেন খেলোয়াড়দের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ করেছে। কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় বাজারে ক্রমেই কারসাজিকারীদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে।
আশার আলোয় হতাশার ছায়া
বাজারে ধারাবাহিক দরপতনের পর মাঝে মাঝে একদিনের সামান্য উত্থানে বিনিয়োগকারীদের মনে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু সেই আশাও পরদিনই ম্লান হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, টানা চার কার্যদিবসের দরপতন কাটিয়ে গতকাল (২০ অক্টোবর) বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। সূচক বেড়েছিল, বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দরও উন্নত হয়। এতে বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন যে, আজ (২১ অক্টোবর) উত্থানের ধারা অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের পর থেকেই সূচকের তীর নিচের দিকে নামতে শুরু করে এবং দিনশেষ পর্যন্ত সেই পতন অব্যাহত থাকে। এতে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পরিণত হয় হতাশায়।
কারসাজির কৌশল: বাজার পতন থেকে মুনাফা উত্তোলন
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলোয়াড়রা বাজারে কৃত্রিম দরপতন ঘটিয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ার স্বল্পমূল্যে সংগ্রহ করে। পরে তারা বাজারে কৃত্রিম উত্থান সৃষ্টি করে সেই শেয়ার বিক্রি করে অল্প সময়ে বিপুল মুনাফা তুলতে সক্ষম হয়।
এভাবেই সূচক দিনের প্রথম ভাগে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী দেখালেও, দিন শেষে আবার পতনের মুখে পড়ে। ফলে লেনদেনের পরিমাণ টাকার অঙ্কে বাড়লেও, বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত লাভ কমে যায়।
সূচকের অবস্থা (২১ অক্টোবর ২০২৫)
আজ সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস (সোমবার, ২১ অক্টোবর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকগুলো নিম্নরূপ—
-
ডিএসইএক্স সূচক: ২২.২৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫,০৮৯.৩২ পয়েন্টে
-
ডিএসইএস সূচক: ৩.৯৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১,০৭৭.২১ পয়েন্টে
-
ডিএসই-৩০ সূচক: ৩.০৫ পয়েন্ট বেড়ে ১,৯৬৮.৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে
আজ ডিএসইতে ৩৯৩টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে—
-
৮০টির দর বেড়েছে
-
২৪১টির দর কমেছে
-
৭২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে
লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে
-
আজ ডিএসইতে মোট ৪৭৮ কোটি ১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
আগের দিন (২০ অক্টোবর) লেনদেন হয়েছিল ৩৯৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার।
অর্থাৎ, আজ ৮৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকার লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) মিশ্র প্রবণতা
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) আজ লেনদেন হয়েছে ১২ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
আগের দিন সেখানে লেনদেন হয়েছিল ১৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার, অর্থাৎ লেনদেন কমেছে।
সিএসইতে আজ ২০৫টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে—
-
৮৭টির দর বেড়েছে,
-
৯৪টির দর কমেছে,
-
২৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩০.৩৮ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,২৯২.৭৪ পয়েন্টে,
যেখানে আগেরদিন সূচক বেড়েছিল ১৮.৮৯ পয়েন্ট।
বাজারে আস্থাহীনতা ও নিয়ন্ত্রকের দায়
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে আস্থাহীনতা বাড়ছে মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে। তারা বলেন, “যখন বাজারে খেলোয়াড়রা কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিম দরপতন ঘটাচ্ছে, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ছিল কার্যকর তদন্ত ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তারা নীরব থেকে বিনিয়োগকারীদের আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনই যদি বাজারে কঠোর মনিটরিং ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আসন্ন সপ্তাহগুলোতে সূচকের পতন আরও গভীর হতে পারে।


