জিকিউ বলপেনে বেপরোয়া কারসাজি, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা

সময়: রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫ ৮:১২:৫৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে জিকিউ বলপেনকে ঘিরে কারসাজির অভিযোগ বহুদিনের। সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির কারসাজিকারীরা যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আজকের বাজারজুড়ে পতনের মাঝেও কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৪ টাকা ৩০ পয়সা বা ৪.২৫ শতাংশ। দিনশেষে শেয়ারটি ৫৯৬ টাকা ৭০ পয়সায় ক্লোজ হয়, যা বাজার সংশ্লিষ্টদের বিস্মিত করেছে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে কারসাজিকারীরা সার্বিক বাজার প্রবণতা তোয়াক্কা করছে না। তারা ইচ্ছেমতো দর বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করছে এবং কার্যত জানাচ্ছে—বাজার ভেঙে পড়লেও তাদের স্বার্থসিদ্ধি অব্যাহত থাকবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপস্থিতি তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

অনেক বিনিয়োগকারীর অভিযোগ, জিকিউ বলপেনের পেছনে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়, যাদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু অসাধু কর্মকর্তার আঁতাত রয়েছে। এ কারণেই বারবার শেয়ারের দর টানাটানি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বিনিয়োগকারীদের মতে, তাদের জন্য শেয়ারবাজার হয়ে উঠেছে “অরিক্ষিত মতিঝিল”।

আজকের লেনদেনে যখন বাজারের ২৮০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর নিম্নমুখী ছিল, তখন লোকসানি ও দুর্বল আর্থিক অবস্থার জিকিউ বলপেন উল্টো উর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের অন্যায্য খেলা চলতে থাকলে শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দ্রুত ভেঙে পড়বে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, কোম্পানিটি টানা তিন বছর ধরে লোকসান দেখাচ্ছে। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি লোকসান (EPS) হয়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সা, ২০২৩ সালে ছিল ১২ পয়সা এবং ২০২২ সালে লোকসান ছিল ২ টাকা ৬৫ পয়সা। অথচ কোম্পানিটি ২০২৪ সালে ৩ শতাংশ এবং আগের দুই বছরে ২.৫০ শতাংশ লোক দেখানো ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এ কারণে শেয়ারটি বছরজুড়ে কারসাজির কবলে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, জিকিউ বলপেনে বিনিয়োগের পক্ষে কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কোম্পানিটির পিই রেশিও নেতিবাচক এবং আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু মাত্র ৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধন থাকায় কারসাজিকারীরা সহজেই এই শেয়ার নিয়ে খেলা করছে এবং দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তুলছে। এ ক্ষেত্রে বিএসইসি ও ডিএসইর কিছু কর্মকর্তার ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ২২ জুন জিকিউ বলপেনের শেয়ারদর ছিল ১৬০ টাকার নিচে। টানা উর্ধ্বমুখী হয়ে আজ ক্লোজিং হয়েছে ৫৯৬ টাকা ৭০ পয়সায়। বিপরীতে একই খাতের বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) ২০২৪ সালে ২৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে এবং চলতি ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় (EPS) দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ২৮ পয়সা। আর্থিক উন্নতির এমন প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিএসসির শেয়ার এখনো ১১৫ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে এবং আজও দরপতনের শিকার হয়েছে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু জরিমানা বা লোকদেখানো শাস্তি দিয়ে কারসাজি ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নইলে শেয়ারবাজার অল্প কয়েকজন কারসাজিকারীর নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে।

 

Share
নিউজটি ১৩৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged