নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওকে শেয়ারবাজারের ‘নতুন রক্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দেশের পুঁজিবাজারে সেই নতুন রক্তপ্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিদায়ের পথে থাকা ২০২৫ সালে শেয়ারবাজারে একটিও আইপিও আসেনি। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এই প্রথম পুরো একটি বছর কোনো আইপিও ছাড়াই পার হচ্ছে, যা বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে অস্বাভাবিক এবং দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইপিও এলে শেয়ারবাজারে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় এবং বাজারে তারল্য বাড়ে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও বাজারে এলে নতুন বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং লেনদেনে গতি এসেছে। সে কারণে বাজারে প্রাণ ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত নতুন ও মানসম্মত কোম্পানিকে আইপিওতে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। দীর্ঘ সময় আইপিও বন্ধ থাকলে বিনিয়োগের বিকল্প পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের শেয়ারবাজারে সর্বশেষ আইপিও আসে টেকনো ড্রাগসের। ২০২৪ সালের জুনে কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে। এরপর দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আর কোনো কোম্পানির আইপিও আসেনি। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় আইপিও বন্ধ থাকার নজির আগে দেখা যায়নি। এমনকি একটি পুরো বছর আইপিও না আসার ঘটনাও এটিই প্রথম।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময়ে ২০২০ ও ২০২১ সালে টানা দুই বছর আইপিওর মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হয়। তবে ২০২২ সালে আইপিওর সংখ্যা কমতে শুরু করে। এরপর ২০২৩ সালে আইপিও কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামে, যা ২০২৪ সালেও অব্যাহত থাকে।
২০২৪ সালে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও টেকনো ড্রাগস। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংক স্থির মূল্য পদ্ধতিতে আইপিওতে আসে, আর বাকি তিনটি কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়। এনআরবি ব্যাংক আইপিও থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। বেস্ট হোল্ডিং ৩৫০ কোটি টাকা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ৯৫ কোটি টাকা এবং টেকনো ড্রাগস ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। সব মিলিয়ে চারটি কোম্পানি আইপিও থেকে মোট ৬৪৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে।
এর আগের বছর ২০২৩ সালে আইপিওতে আসে তিনটি কোম্পানি ও একটি মিউচুয়াল ফান্ড। সেগুলো হলো—মিডল্যান্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শিকদার ইন্স্যুরেন্স এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড। এ চারটি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে মোট ২০২ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংক ৭০ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও শিকদার ইন্স্যুরেন্স প্রত্যেকে ১৬ কোটি টাকা এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে।
২০২২ সালে ছয়টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৬২৬ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার টাকা উত্তোলন করে। ২০২১ সালে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আইপিওতে এসে মোট এক হাজার ৮৫৮ কোটি ৪৪ লাখ ৪ হাজার টাকা সংগ্রহ করে, যার মধ্যে বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক একাই উত্তোলন করে ৪২৫ কোটি ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ২০২০ সালে আটটি প্রতিষ্ঠান ৯৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা উত্তোলন করে।
এর আগে ২০১৯ সালে নয়টি প্রতিষ্ঠান ৬৫২ কোটি টাকা, ২০১৮ সালে ১৪টি প্রতিষ্ঠান ৬০১ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে আটটি প্রতিষ্ঠান ৪১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ১১টি প্রতিষ্ঠান ৮৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং ২০১৫ সালে ১২টি প্রতিষ্ঠান ৮৩০ কোটি ৭২ লাখ ২১ হাজার টাকা আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করে। ২০১৪ সালে ২০টি প্রতিষ্ঠান এক হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ১২টি প্রতিষ্ঠান ৮৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২০১২ সালে ১৭টি প্রতিষ্ঠান এক হাজার ২০৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা উত্তোলন করে। এছাড়া ২০১১ সালে ১৩টি প্রতিষ্ঠান এক হাজার ৬৭৭ কোটি ৭১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ২০১০ সালে ১৮টি প্রতিষ্ঠান এক হাজার ১৮৬ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ২০০৯ সালে ১৭টি প্রতিষ্ঠান ৪৩৫ কোটি ৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করে।
আইপিও পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও জাগো নিউজকে বলেন, আইপিও ছাড়া কোনো শেয়ারবাজার কল্পনা করা যায় না। আইপিও শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইপিও না আসা বাজারের জন্য বড় ধরনের লোকসান।
তিনি বলেন, ভালো আইপিও এলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে আসেন। গ্রামীণফোন, ওয়ালটন, স্কয়ার ফার্মা, রবি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আইপিও বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
ডিএসই পরিচালক আরও বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম, ট্রেডারের সংখ্যা বেশি। অনেক বিনিয়োগকারী আইপিওর মাধ্যমেই প্রথম শেয়ারবাজারে আসেন এবং ধীরে ধীরে বড় বিনিয়োগকারীতে পরিণত হন।
আগামী বছর নিয়ে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যাশার আগে বাজারের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। বিক্রির চাপ, আইসিবির বিনিয়োগ সংকট, ব্যাংক একীভূতকরণের প্রভাব এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপের মধ্যেও বাজার ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। ইতিবাচক দিক হলো—সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং আইনগত ফাঁকফোকর দূর করার কাজ চলমান রয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আইপিও শেয়ারবাজারের ‘নিউ ব্লাড’। এই প্রবাহ বন্ধ থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে বাজার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। নতুন ভালো কোম্পানির আইপিও এলে যেমন নতুন বিনিয়োগকারী আসে, তেমনি বাজারে তারল্য ও গভীরতাও বাড়ে। কেন আইপিও আসছে না—তা চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


