নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের ঘাটতি প্রকট। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ৬৬টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মার্চেন্ট ব্যাংকের কার্যত নিষ্ক্রিয়তা বাজারের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে একটি মার্চেন্ট ব্যাংকও নতুন কোনো আইপিও বাজারে আনতে পারেনি। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ, অথচ ইক্যুইটি মার্কেটের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের বিকল্প পথটি কার্যত বন্ধই রয়ে গেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রাথমিক বাজারে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। ফলে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিএসইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পাবলিক ইস্যু রুলস অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৪২টি মার্চেন্ট ব্যাংক একটি কার্যকর আইপিও প্রস্তাবও জমা দিতে পারেনি। অথচ বিধি অনুযায়ী প্রতি মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতি দুই বছরে অন্তত একটি করে আইপিও বাজারে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের মূল দায়িত্ব ‘ইস্যু ম্যানেজমেন্ট’ থেকে সরে গিয়ে তুলনামূলক সহজ মুনাফার আশায় নিজস্ব পোর্টফোলিও পরিচালনা, শেয়ার কেনাবেচা ও প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রবণতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার ফলেই পুরো খাতটি আজ স্থবিরতায় পড়েছে।
আইপিও কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর নিজস্ব আর্থিক অবস্থাও নাজুক হয়ে উঠছে। শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় অচল। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ে যাচ্ছে, এমনকি নিয়মিত বেতন পরিশোধ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন কমিশনের নীতিগত কঠোরতার কারণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহসংক্রান্ত আবেদন বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিএসইসির কঠোর অবস্থানের ফলে অনেক কোম্পানি ও ইস্যু ম্যানেজার নতুন করে আইপিও আবেদন করতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই স্থবিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত এক বছরে ভারতে ৩৭৩টি আইপিও ও এসএমই লিস্টিং সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশে সেই সংখ্যা শূন্য। চলমান সংকট কাটাতে বিএসইসি জানিয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার সংক্রান্ত বিধিমালা হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অদক্ষ ও নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিমত, আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং কেবল দক্ষ ও সক্রিয় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বাজারে টিকিয়ে রাখা ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী খরা কাটানোর বিকল্প নেই। তা না হলে উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে চড়া সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বেসরকারি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।


