নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) পদ্মা ব্যাংকে আটকে থাকা ১৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা ফেরত না পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে। এ অর্থ প্লেসমেন্ট শেয়ার সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত ব্যাংক পুরো অর্থ ফেরত না দেওয়ায় কোম্পানিটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে।
এ অবস্থায় শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চিঠি দিয়েছে।
কিভাবে আটকে গেল অর্থ
ন্যাশনাল টি কোম্পানি ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ২৭৯ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করতে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করে। এর প্রথম ধাপের সাবস্ক্রিপশন শেষ হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা পদ্মা ব্যাংকের গুলশান কর্পোরেট শাখায় ৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা জমা দেন। তবে ব্যাংকটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে মাত্র ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে, বাকিটা ফেরত দেয়নি।
অর্থ ফেরত না পাওয়ায় ন্যাশনাল টি কোম্পানি গত ২০ আগস্ট বিএসইসির কাছে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেয়। বিএসইসি সেই চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রেরণ করে জানায়, শেয়ার সাবস্ক্রিপশনের অর্থ পূবালী ব্যাংকে স্থানান্তরের নির্দেশ থাকলেও পদ্মা ব্যাংক তা করেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের ১৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা আটকে যায়।
পদ্মা ব্যাংকের অবস্থান
পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সিইও) কাজী মো. তালহা স্বীকার করেছেন ব্যাংকের গুরুতর তারল্য সংকটের কথা। তিনি জানান, আংশিক টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি অর্থ ধাপে ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে ব্যাংক বর্তমানে আমানতের সংকটে পড়েছে। নতুন আমানত আসছে না, বরং গ্রাহকরা আমানত তুলে নিচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণ আদায়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তারল্য সংকট মেটাতে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় জমা হওয়া অর্থ খরচ হয়ে গেছে।
খেলাপি ঋণ ও লোকসানের চিত্র
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের স্থূল খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,১০৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯০.৫৫ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকের সমন্বিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫,৩৪৯ কোটি টাকা। ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল ৫,৬৪১ কোটি টাকা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতও ঝুঁকিতে
বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকে প্রায় ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট ২,০০০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট রেখেছে ৮৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া আইসিবি, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন, তিতাস গ্যাস, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত রয়েছে।
সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় পদ্মা ব্যাংককে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে।
পরিস্থিতি সংকটময়
ন্যাশনাল টি কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারের টাকা ফেরত না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি যেমন আর্থিক সংকটে পড়েছে, তেমনি পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে এবং ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।


