নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলো বর্তমানে শুধু আর্থিক দুর্বলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়েই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ থাকা, আদায় অযোগ্য পাওনা এবং সম্পদের অতিমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে খাতটির আর্থিক ও পরিচালনাগত অবস্থা ক্রমেই সংকটময় হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১১টি বিদ্যুৎ কোম্পানির মধ্যে অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) জানিয়েছে, চুক্তি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও আর্থিক দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ছাড়া এই খাতে বিনিয়োগ টেকসই হতে পারে না। তারা বলছেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে গ্যাস সংকট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে পিপিএ মেয়াদ শেষ হওয়া কেন্দ্রগুলো চালু রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
অডিট রিপোর্টে যদি কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকে, তবে তা বিনিয়োগকারীদের স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক বলেও মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ–এর আর্থিক অনিয়ম সবচেয়ে প্রকটভাবে উঠে এসেছে। বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ ক্ষতি মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার সম্পদ যথাযথ যাচাই ছাড়াই হিসাবভুক্ত করা হয়েছে এবং বিতর্কিত পাওনার বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি। সুদ ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।
এর প্রভাব হিসেবে ২০২৩ ও ২০২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি ৮ টাকা ও ৫ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। ফলে পাওয়ার গ্রিড বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে।
পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান জানান, ভেন্ডর চুক্তি সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং প্রয়োজনে সুদ ব্যয়ের সমন্বয় করা হবে।
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে। কোম্পানিটির মোট ৫৬০ কোটি টাকার পাওনার মধ্যে প্রায় ৩১১ কোটি টাকা আদায় অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হলেও প্রভিশন রাখা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাতিল হওয়া গুলশান সাবস্টেশন প্রকল্প এখনও সিডব্লিউআইপি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
ডেসকো ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। কোম্পানির সচিব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান জানান, বিহারি ক্যাম্প এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ ২৬৩ কোটি টাকার বকেয়া নিয়ে মামলা চলমান থাকায় এটি প্রভিশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বারাকা পাওয়ার লিমিটেড ১৫৫ কোটি টাকার বেশি জামানতহীন ঋণ দিয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৫১ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পিপিএ শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে। তবে এখনো সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী জানান, সরকারের হঠাৎ চুক্তি স্থগিতের কারণেই প্ল্যান্টটি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
খুলনা পাওয়ার কোম্পানি–এর ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩–এর পিপিএ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। আগস্ট মাস থেকে কেন্দ্র বন্ধ থাকায় সম্পদের মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টানা পাঁচ বছর লোকসানে থাকার কারণে কোম্পানিটি বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে।
এদিকে ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি–এর তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পিপিএ শেষ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ আয়ের বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্র্যাচুইটি এবং দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও অডিট প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব বিদ্যুৎ খাতকে ধীরে ধীরে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তার মতে, চুক্তি নবায়ন ও বাজারমুখী সংস্কার উদ্যোগ ছাড়া উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ খাত টেকসই হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ফিরে আসবে।


