বন্ধ ও ডিভিডেন্ডহীন শেয়ার আলাদা বোর্ডে, আসছে ‘আর’ ক্যাটাগরি

সময়: সোমবার, জানুয়ারি ৫, ২০২৬ ১১:৪৫:০৮ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ, অকেজো অবস্থায় থাকা এবং ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মূল বোর্ড থেকে সরিয়ে একটি পৃথক প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি। প্রস্তাবিত এই নতুন প্ল্যাটফর্মের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর-ক্যাটাগরি’।

কমিটির মতে, বাজারে তথাকথিত পচা বা জাঙ্ক শেয়ার ঘিরে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, কারসাজি ও জল্পনা-কল্পনা বন্ধ করতেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আর-ক্যাটাগরি’ভুক্ত শেয়ারগুলোর লেনদেনে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার পর অন্তত এক মাস তা বিক্রি করা যাবে না, অর্থাৎ লক-ইন পিরিয়ড কার্যকর থাকবে। পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারের ক্ষেত্রে যেখানে লেনদেন নিষ্পত্তিতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে, সেখানে আর-ক্যাটাগরির শেয়ারের সেটেলমেন্ট সময় বাড়িয়ে সাত দিন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই নিয়মগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের এই কমিটি গত নভেম্বর মাসে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদানে ৩ হাজার কোটি টাকার আরেকটি ফান্ড তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশে উন্নীত করা, পাশাপাশি ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ডিভিডেন্ড আয় করমুক্ত রাখার সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩৯৭টি কোম্পানির মধ্যে ২০৫টি ‘এ’ ক্যাটাগরি, ৮২টি ‘বি’ ক্যাটাগরি এবং ১১০টি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা বহু কোম্পানি বছরের পর বছর বন্ধ থাকলেও মাঝেমধ্যে এসব শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত জিল বাংলা সুগার মিলস–এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার শেয়ার দর কয়েক দিনের ব্যবধানে ৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫ টাকায় উঠে যায়। এমন অযৌক্তিক দরবৃদ্ধি রোধ করতেই নতুন ‘আর’ ক্যাটাগরি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অন্তত ৩২টি কোম্পানি দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, যার বড় অংশই বস্ত্র খাতের। এর মধ্যে মেঘনা পিইটি ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০২ সাল থেকে অর্থাৎ ২৩ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া একাধিক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ও লোকসানি কোম্পানি রয়েছে, যাদের ভবিষ্যতে ব্যবসা পুনরায় চালুর বাস্তবসম্মত কোনো সম্ভাবনা নেই।

এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সম্মানজনক ‘এক্সিট প্ল্যান’, অর্থাৎ বাজার থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বের হয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে আসছেন যে, বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানিগুলো মূল বোর্ডে অবস্থান করায় বাজারের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। নতুন ‘আর’ বোর্ড বা ক্যাটাগরি চালু হলে মূল বাজারে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে এবং বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও মৌলভিত্তিক শেয়ারে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন বলে মনে করছে কমিটি।

কমিটির মতে, একই সঙ্গে আইসিবি’র সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিএসইসির কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করলেই কেবল শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার সম্ভব হবে।

Share
নিউজটি ৩২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged