বিএসইসিতে শূন্য কমিশনার পদে দীর্ঘসূত্রতা, বাজারে স্থবিরতা ও আস্থার সংকট

সময়: বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩, ২০২৫ ৭:৫৩:৩১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি কমিশনার পদ গত আট মাস ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। এর ফলে সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, দেশের শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিএসইসির পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, বিএসইসির সাবেক কমিশনার ড. এ টি এম তারিকুজ্জামান ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ হয়ে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন। তার পর থেকে পাঁচ সদস্যের এই কমিশন চারজন সদস্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান কমিশনে রয়েছেন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, এবং সদস্যরা হলেন মু. মোহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখ।

নিয়ম অনুযায়ী, কমিশনের সভা পরিচালনার জন্য অন্তত তিনজন সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। ফলে কোনো সদস্য ছুটিতে থাকলে বা অনুপস্থিত হলে কমিশনের বৈঠক করা কঠিন হয়ে পড়ে, এতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বিলম্বিত হয় এবং শেয়ারবাজারের গতিপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি কমিশনারের দায়িত্বে নির্দিষ্ট বিভাগ থাকে। একজন সদস্য না থাকলে অন্যদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। আইনের ভাষায় কমিশনারদের সার্বক্ষণিক কাজ করতে হবে, একজন না থাকলে সেই ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, নিয়োগটি জরুরি হলেও উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যাঁদের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাঁরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

তবে বাজার বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—আসলেই কি যোগ্যতার অভাব, নাকি পেছনে কাজ করছে শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর চাপ, স্বার্থের সংঘাত এবং নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার রাজনৈতিক কৌশল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “বিএসইসি যেহেতু বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তাই প্রতিটি কমিশনারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। একটি পদ ফাঁকা থাকলে কমিশনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের ওপর।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটি কমিশনার পদ শূন্য থাকলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও নীতিগত স্বচ্ছতা কার্যকর হয় না। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা যেমন কমে যায়, তেমনি বাজার পরিচালনায় জবাবদিহিতার অভাবও দেখা দেয়।

তাঁদের মতে, সরকার যদি ‘যোগ্যতা’ আর ‘সমঝোতা’র ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী পেতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—বিএসইসি কি কেবল আইনের বইয়ে বর্ণিত একটি কাঠামো হয়ে থাকবে, না কি বাস্তবে সক্রিয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে?

এই প্রেক্ষাপটে বাজারসংশ্লিষ্ট মহল দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে। তাঁদের দাবি, সরকারকে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে অবিলম্বে একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও স্বাধীনচেতা কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা যায়। তা না হলে শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা আরও গভীর হবে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত হতে পারে।

 

Share
নিউজটি ১৫৮ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged