বিটিআরসির ভেতরের মতবিরোধে স্থবির গ্রামীণফোনের সালিশ প্রস্তাব

সময়: শনিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০২৬ ৩:১৭:০৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের সঙ্গে সরকারের কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব সংক্রান্ত বিরোধ আদালতের বাইরে সালিশি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির উদ্যোগ আপাতত থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে বিষয়টিতে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অবস্থান নিয়েছে। মূলত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) নিজস্ব আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঐকমত্য না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

এই দীর্ঘদিনের বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা রাজস্ব দাবি করে বিটিআরসি। এই দাবির একটি বড় অংশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গ্রামীণফোন এই দাবি চ্যালেঞ্জ করে ২০১৯ সালেই ঢাকার আদালতে মামলা করে, যা গত ছয় বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে। আপিল বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী কোম্পানিটি ২০২০ সালে ২ হাজার কোটি টাকা জমা দিলেও অবশিষ্ট অর্থ নিয়ে এখনো কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের জুলাই মাসে গ্রামীণফোন আদালতের বাইরে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সালিশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেয়। কোম্পানির বক্তব্য, দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে দ্রুত রায় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, যা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, সালিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব। তবে বিটিআরসির ভেতরে এ নিয়ে ভিন্নমত থাকায় জটিলতা আরও বেড়েছে।

বিটিআরসির এক আইন উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান ‘জাস্টিসিয়ার্স’ মনে করছে, সালিশ আইন ২০০১-এর আওতায় উভয় পক্ষের সম্মতিতে সীমিত পরিসরে এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। অন্যদিকে ‘ক্যাপিটাল ল চেম্বার’ এবং কমিশনের প্যানেল আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, টেলিযোগাযোগ আইনের আওতায় নির্ধারিত এই রাজস্ব দাবি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক বিরোধ নয়, ফলে একে সালিশে নেওয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে নিয়মকানুন প্রয়োগে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টির আইনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। শুরুতে গ্রামীণফোনের প্রস্তাবকে ‘উইন-উইন সমাধান’ হিসেবে দেখা হলেও এখন সম্ভাব্য আইনগত ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি রাজস্বের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আদালতের বাইরে সালিশে নেওয়া কতটা নিরাপদ হবে, সে বিষয়ে নতুন করে আইনজ্ঞদের মতামত চাওয়া হচ্ছে।

গ্রামীণফোনের মতো একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে রয়েছে রবি আজিয়াটা। ২০১৯ সালে তাদের বিরুদ্ধেও ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার নিরীক্ষা দাবি উত্থাপন করা হয়। রবিও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সেখানেও আইনি জটিলতা কাটেনি। সম্প্রতি ১১ জানুয়ারি গ্রামীণফোন মামলার মধ্যস্থতার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ২৬ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে। রবির মামলার শুনানিও একইভাবে এপ্রিল মাসে পিছিয়েছে। ফলে সরকারি সিদ্ধান্ত ও আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দেশের দুই শীর্ষ টেলিকম অপারেটরের এই বিলিয়ন ডলারের অডিট বিরোধ এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

Share
নিউজটি ৩ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged