বিশেষ প্রতিবেদক: বিদ্যমান বীমা আইনের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী এনে প্রস্তাবিত খসড়ার উপর চূড়ান্ত মতামত গ্রহণের জন্য অংশীজনদের নিয়ে সভা করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
গতকাল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বীমা আইন ২০১০ এর সংশোধিত খসড়ার বিভিন্ন ধারা- উপধারা সম্পর্কে নিজেদের অভিমত তুলে ধরেন বীমা খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ। সভায় অংশীজনদের আপত্তির প্রেক্ষিতে সংশোধিত খসড়ায় সংযোজিত, বীমা কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাতিলের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে আইডিআরএ। একইসঙ্গে এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার একটি মাপকাঠি নির্ধারণের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন সংশ্লিষ্টরা।
বীমা আইন ২০১০ এর খসড়া সংশোধনীতে ১১টি নতুন ধারা সংযোজন এবং ৪টি ধারা বিয়োজনসহ সর্বমোট ৪৯টি ধারা-উপধারায় সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের চূড়ান্ত মতামত গ্রহণের পর এ পর্যায়ে শিগগিরই সংশোধিত আইনের খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠাবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
বীমা আইন ২০১০ এর সংশোধনী বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সভায় অংশ নেয়া এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমাম শাহীন দৈনিক শেয়ারবাজার প্রতিদিনকে বলেন, বীমা আইনে যেসব সংশোধন প্রস্তাব আনা হয়েছে এর মধ্যে বীমা খাতের জন্য যেগুলো দীর্ঘ মেয়াদে কল্যাণকর, সেসব বিষয়ে সভায় উপস্থিত অংশীজনরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফেরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম নুরুজ্জামান জানান, বীমা আইনকে আরো যুগোপযোগী ও অধিকতর কার্যকর করার লক্ষ্যে গ্রাহকের স্বার্থে যেসব প্রস্তাবনা আনা হয়েছে সেসব বিষয়ে আমরা একমত পোষণ করেছি।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে- বীমা কোম্পানির সম্পদ বা বিনিয়োগ জামানত রেখে পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার বা তাদের পরিবার অথবা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কারো থেকে ঋণ প্রাপ্তিতে বীমা কোম্পানিগুলোর সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বীমা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন কোন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার বা তাদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোন ঋণ প্রদানবা অন্যকোনভাবে আর্থিক সুবিধা প্রদান করা যাবে না সংশোধিত বীমা আইন অনুযায়ী।
বীমা কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয় সংশোধিত খসড়ায়।
এতে বলা হয়, কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বীমা কোম্পানির সিএফও বা কোম্পানি সচিব হিসেবে নিয়োগ করতে হবে। অনুমোদিত কোন প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানির সচিবকে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত করা যাবে না।
এ ধরনের ক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিব কোম্পানির স্বার্থক্ষুন্ন হয় এমন কোন কাজ করেছেন কি না এবং এ ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে লিখিত আদেশের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করতে হবে। এভাবে চাকরিচ্যুত হওয়ার পরবর্তী ৫ বছর তিনি কোন বীমা কোম্পানিতে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।
বীমাকারী কোন ব্যক্তি প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিব হওয়ার বা ওই পদে না থাকার বিষয়ে জানার ১৫ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবে। বীমা কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানির সচিব পদ একাধারে ৩ মাসের অধিক সময়ের জন্য শূন্য রাখা যাবে না। তবে কর্তৃপক্ষ অপরিহার্য পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিবার ওই সময়সীমা আরও এক মাস বাড়াতে পারবে বলেও শর্তারোপ করা হয় সংশোধিত খসড়ায়।
বীমা আইন ২০১০ এর সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, উপদেষ্টা বা কনসালটেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনুমোদন নিতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। বীমা কোম্পানিতে সর্বোচ্চ ২ জন উপদেষ্টা বা কনসালটেন্ট নিয়োগ করা যাবে, যাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংকাস্যুরেন্স ও করপোরেট এজেন্ট সম্পর্কিত কয়েকটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে বীমা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে।
পরিবারের সংজ্ঞায় কিছুটা সংযোজন আনা হয়েছে। বলা হয়েছে- স্বামী বা স্ত্রী, পিতা বা মাতা, নির্ভরশীল পূত্র অথবা কন্যা, নির্ভরশীল ভাই অথবা বোন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল প্রাকৃতিক ব্যক্তিস্বত্তার সকলেই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হবে। বীমা দাবি পরিশোধের সময়সীমা ৯০ দিনের পরিবর্তে ৪৫ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ৪৫ দিনের মধ্যে বীমা দাবি পরিশোধ করতে না পারলে পরবর্তী দিনগুলোর জন্য সুদসহ বীমার টাকা ফেরত দিতে হবে গ্রাহককে।
সংশোধিত আইনে, বীমা কোম্পানির পরিচালক সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ জন-ই থাকছে। তবে নিরপেক্ষ পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কোন কোম্পানির পরিচালক সংখ্যা ১০ জনের বেশি হলে নিরপেক্ষ পরিচালক থাকবেন ৪ জন, এর কম হলে থাকবেন ২ জন।
সংশোধিত আইনের খসড়ায় নতুন একটি ধারার সংযোজন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নিরপেক্ষ পরিচালক অর্থ এইরূপ ব্যক্তি, যিনি বিমাকারীর ব্যবস্থাপনা ও শেয়ারধারক থেকে স্বাধীন এবং যিনি প্রযোজ্য আইন, বিধি ও প্রবিধান পরিপালন নিশ্চিত করে বিমাকারীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট মতামত দেবেন। শুধু বিমাকারীর স্বার্থে নিজ মতামত দেবেন এবং বিমাকারীর বা বিমাকারী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যার অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কোনো স্বার্থের বিষয় জড়িত নেই। এছাড়া আইডিআরএ’র অনুমোদন ব্যতীত বিমাকারী তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বা সহপ্রতিষ্ঠান থেকে এর পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার বা তাদের পরিবার বা তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো ঋণ দিতে বা অন্য কোনোভাবে আর্থিক সুবিধা দিতে পারবে না।
প্রত্যেক বিমাকারী আইডিআরএ’র অনুমোদন মোতাবেক প্রয়োজনীয় সংখ্যক একচ্যুয়ারি নিয়োগ করবেন। তার যোগ্যতা, দায়িত্ব, সুবিধা ও শর্তগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারণ করবে।
আরেকটি ধারার সংশোধনে প্রস্তাব করা হয়েছে কোনো ব্যক্তি বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা বা প্রতারণামূলক বলে জানেন, এমন বিবরণী, আশ্বাস, পূর্বাভাস দ্বারা, বা প্রতারণামূলক পূর্বাভাস কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিমাকারীর সঙ্গে বিমা চুক্তির প্রস্তাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলে তিনি এই অপরাধে অভিযুক্ত হবেন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে। সেই ব্যক্তি তিন বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অপর আরেক ধারার সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে- বিমা আইন ২০১০ এর মতো কোনো বিধান না থাকলে কোনো বীমা কোম্পানির কোনো পরিচালক, শেয়ারহোল্ডার, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক বা অন্য কর্মকর্তা এই আইনের কোনো বিধান পালনে ব্যর্থ হলে তাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ও সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা এবং লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে সেই সময় প্রতিদিনের জন্য অনধিক ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ জরিমানা করা যাবে। বর্তমান আইনে যা এক লাখ টাকা, ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ হাজার টাকা।


