নিজস্ব প্রতিবেদক: বেক্সিমকোর অচল কারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে সরকার যখন আন্তর্জাতিক লিজ চুক্তির উদ্যোগে অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক সেই সময় রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি কারখানা নিলামে তোলার কার্যক্রম শুরু করেছে। হাজারো কর্মীর চাকরি রক্ষা এবং দেশের রপ্তানি আয় ধরে রাখার সরকারি প্রচেষ্টার বিপরীতে ব্যাংকের এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।
গত ২০ নভেম্বর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। যদিও মূলত ১৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সভার প্রধান আলোচ্য ছিল বেক্সিমকো, জনতা ব্যাংক এবং জাপানের রিভাইভাল প্রজেক্ট লিমিটেড–এর লিজ চুক্তির খসড়া অনুমোদন। কিন্তু বৈঠক পিছিয়ে দিয়ে আলোচ্যসূচিও পরিবর্তন করা হয় এবং নিলাম বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সভার পরদিনই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের তিনটি কারখানার বন্ধকি সম্পত্তি—মোট ১৯৩ শতাংশ জমি ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা—নিলামে তোলার গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ব্যাংক সূত্র জানায়, বাকি তিন কারখানার নিলাম বিজ্ঞপ্তিও শিগগিরই প্রকাশিত হবে।
১ নভেম্বর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানের দেনার পরিমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেল লিমিটেডের (ইউনিট–১ ও ২) ৫৪৩.৭ কোটি টাকার মূল ঋণ সুদসহ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫৪.৭ কোটি টাকা। আরবান ফ্যাশন্সের ২৫২.৪৫ কোটি টাকার ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭২৪.২৬ কোটি টাকা। অ্যাপোলো অ্যাপারেলসের ২৫১.২৬ কোটি টাকার ঋণ সর্বমোট ৮১৬.৪ কোটি টাকাতে উন্নীত হয়েছে। এই তিন কারখানার জমি, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি এবং মজুত পণ্য নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পরবর্তীতে ক্রিসেন্ট ফ্যাশনস (১ হাজার ৩৯৭ কোটি), অ্যাসেস ফ্যাশন (১ হাজার ১৩৫ কোটি) এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানির (১ হাজার ৩১৬ কোটি) বন্ধকি সম্পত্তিও নিলামের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে বেক্সিমকোর আন্তর্জাতিক মানের টেক্সটাইল কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের চাকরি টিকিয়ে রাখা ও রপ্তানি খাতকে সমর্থন দিতে শ্রম মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে জাপানের রিভাইভাল প্রজেক্ট লিমিটেড কারখানাগুলো লিজ নেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে ইওআই জমা দেয় এবং বেক্সিমকোও সেই প্রস্তাবে সন্তুষ্টি জানায়।
পরে সরকার মিলগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে উদ্যোগ নেয় এবং গত ২২ জুলাই শ্রম মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে প্রথম বৈঠক হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গঠিত ১১ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি ও পাঁচ সদস্যের আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটিও রিভাইভালের প্রস্তাবে সমর্থন দেয়। লিজ চুক্তির খসড়ায় উল্লেখ ছিল—রিভাইভাল প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদে ১০ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে। তারা কারখানা পরিচালনা করবে, রপ্তানি আয়ের ১.৫% থেকে ২.৫% কমিশন পাবে এবং বাকি অর্থ পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে জনতা ব্যাংকসহ ঋণদাতাদের পরিশোধে যাবে; তবে বেক্সিমকো সরাসরি কোনো অর্থ পাবে না। ৮ অক্টোবর লিজ চুক্তির খসড়া তৈরি হয় এবং ১৮ নভেম্বর বোর্ড অনুমোদনের কথা থাকলেও সভা পিছিয়ে ২০ নভেম্বর করা হয়, যেখানে আলোচনার ফোকাস লিজ থেকে সরে গিয়ে নিলাম পরিকল্পনায় চলে যায়।


