সূচক কমলেও বেড়েছে লেনদেন

বৈঠকের পর বাজারে ‘মরীচিকা’ বাস্তবতা

সময়: মঙ্গলবার, মে ১৩, ২০২৫ ৫:০৮:৩৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের পুঁজিবাজারে ফের ধস নেমেছে। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল, প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর বাজারে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরবে। তবে বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। মঙ্গলবার (১৩ মে) লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) — উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই সূচক উল্লেখযোগ্য হারে পতিত হয়।

আশাবাদের পর ভরাডুবি

বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোববার সরকারি ছুটির দিনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক উপস্থিত ছিলেন।

এই বৈঠককে কেন্দ্র করে বাজারে আশার সঞ্চার হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, তারল্য বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকর নীতিগত ও আর্থিক পদক্ষেপ আসবে। এরই প্রেক্ষিতে বৈঠকের আগের দিন বৃহস্পতিবার ডিএসইতে সূচক বেড়ে যায় প্রায় ১০০ পয়েন্ট।

কিন্তু বৈঠক শেষে কোনো বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত বা দৃশ্যমান প্রণোদনার ঘোষণা না আসায় বিনিয়োগকারীদের আশা দ্রুত হতাশায় রূপ নেয়। পুরোনো বক্তব্যের পুনরাবৃত্তির বাইরে কিছু না থাকায় সোমবার থেকেই সূচক নেতিবাচক ধারায় ফিরে যায়, আর মঙ্গলবার তা রূপ নেয় বড় ধসে।

সূচকের পরিসংখ্যান

মঙ্গলবার লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৪৬.৯৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৪,৮৭৪.৫৮ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমে ১,০৬৩.৩৪ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক নেমে আসে ১,৭৯৮.৩৭ পয়েন্টে।

ডিএসইতে এদিন মোট লেনদেন হয় ৩৪৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি টাকা কম। লেনদেন হওয়া ৩৯৮টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৫৪টির, কমেছে ৩০৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৫টির দর।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সিএসইতে দিনশেষে সার্বিক সূচক (সিএএসপিআই) ৩৬.৯৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ১৩,৬৮৬ পয়েন্টে। সিএসইতে এদিন লেনদেন হয় ৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার, যা আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও সূচকের পতন থামেনি। লেনদেন হওয়া ২০১টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ৫৫টির, কমেছে ১১৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির।

বিনিয়োগকারীদের হতাশা ও ক্ষোভ

মতিঝিলের বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা চরম হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। এক বিনিয়োগকারী বলেন, “বৈঠক হলো, বক্তৃতাও হলো, কিন্তু বাস্তবে কোনো সুফল পেলাম না। আমাদের পুঁজি তো ক্রমেই গলে যাচ্ছে।”

একজন মধ্যবয়সী বিনিয়োগকারী আক্ষেপ করে বলেন, “বাজার নিয়ে কিছুদিন আগে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, সবই ছিল মরীচিকা।”

আবদুর রহমান নামে এক তরুণ বিনিয়োগকারী বলেন, “রাশেদ মাকসুদ পুরো শেয়ারবাজার ধ্বংস করে দিচ্ছেন। অর্থ উপদেষ্টা কেন তাঁকে এখনো ধরে রেখেছেন, সেটা বোধগম্য নয়। যদি তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ হন, তাহলে তাঁকে অন্য কোনো দায়িত্বে পাঠানো হোক।”

দিকহীন বাজার, আস্থাহীন বিনিয়োগকারী

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজার বর্তমানে চরম দিকহীনতার মধ্যে রয়েছে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকেও যখন কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত আসে না, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বিনষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না, আবার যাঁরা আগেই বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের শেয়ার আটকে আছে লোকসানে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান কমিশনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রায় শূন্যের কোটায় চলে এসেছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় বাজারের এই ধস আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Share
নিউজটি ১৪৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged