ব্যাংকিং খাতে বৈচিত্র্য: ঋণচাহিদা হ্রাসেও ট্রেজারি আয়ে ছয় ব্যাংকের আকাশছোঁয়া মুনাফা

সময়: শনিবার, নভেম্বর ১, ২০২৫ ৭:০৬:৫৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, কমে যাওয়া ঋণচাহিদা এবং বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণের মধ্যেও দেশের ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর) রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে। চলতি সময়েই তারা ২০২৪ সালের পুরো বছরের মুনাফাকে ছাড়িয়ে গেছে।

এই ব্যতিক্রমী আর্থিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং ঢাকা ব্যাংক। তাদের এই সাফল্য এসেছে মূলত ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ভর করে।

অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক গত বছরের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি–সেপ্টেম্বরে তাদের মুনাফা ছিল ১০৮ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯ কোটি টাকায়।

? ট্রেজারি আয়ে ভর করে বেড়েছে ব্যাংকগুলোর আয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ছয়টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ৭ হাজার ৪১১ কোটি টাকা আয় করেছে শুধুমাত্র ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এড়িয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে।

তবে তাদের মূল ব্যবসা—ঋণ বিতরণ—সে ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই উল্টো। ঋণ বিতরণ থেকে ব্যাংকগুলোর নিট সুদের আয় (Net Interest Income) গত বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকায়।

? ব্যাংকভিত্তিক মুনাফার চিত্র
এই সময়ের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ব্যাংকটি জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুনাফা করেছে ১,৫৩৬ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ১,৪৩২ কোটি টাকা।

পূবালী ব্যাংক করেছে ৯০০ কোটি টাকার মুনাফা, যা আগের বছর ছিল ৭৬২ কোটি টাকা।

যমুনা ব্যাংক এ বছর ৪১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে, যা গত বছর ছিল ২৭৯ কোটি টাকা।

ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫১ কোটি টাকায়, আগের বছর একই সময়ে ছিল ২৭৭ কোটি টাকা।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক চমকপ্রদ উন্নতি দেখিয়েছে—তাদের মুনাফা ২০২৪ সালের ১৬৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

আর ঢাকা ব্যাংক ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ১৪০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা গত বছর ছিল ১২৭ কোটি টাকা।

? অন্যান্য ব্যাংকের পারফরম্যান্স
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক টেকসই ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও মুনাফা বেড়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের মুনাফা ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকায়, আর সিটি ব্যাংক অর্জন করেছে ৭২২ কোটি টাকার মুনাফা। যদিও এই দুটি ব্যাংক এখনও ২০২৪ সালের পূর্ণ বছরের মুনাফাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।

? বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন,

“বর্তমান ব্যাংকিং বাজার অত্যন্ত অসম হয়ে পড়েছে। কিছু ব্যাংক বিপুল মুনাফা করছে, অন্যদিকে অনেক ব্যাংক টিকে থাকার লড়াই করছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে আমানত স্থানান্তর হয়ে ভালো পারফর্ম করা ব্যাংকগুলোর দিকে চলে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “যদিও ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিনিয়োগ থেকে প্রচুর আয় করছে, তবে এই আয়ের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীল খাত তেমন উপকৃত হচ্ছে না। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই ঋণ বিতরণ ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।”

? ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সতর্কতা এবং ব্যবসায়িক আস্থার অভাবকেই প্রতিফলিত করে।

? উপসংহার
দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে একটি স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একদিকে কিছু ব্যাংক ট্রেজারি আয়ে রেকর্ড মুনাফা করছে, অন্যদিকে ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ট্রেজারি-নির্ভর মুনাফা টেকসই নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করতে হলে ব্যাংকগুলোকে আবারও ঋণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে মনোযোগী হতে হবে, তবেই প্রকৃত অর্থে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

Share
নিউজটি ৭২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged