ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ডিএসইর আমানত ঝুঁকিতে

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ১, ২০২৫ ১:৫০:২১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, মোট ৮৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। এই অর্থ চারটি দুর্বল অবস্থায় থাকা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে জমা ছিল, যারা এখন একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তারল্য সংকট ও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে এফডিআরের মেয়াদ শেষ হলেও ব্যাংকগুলো ডিএসইকে অর্থ ফেরত দিতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিতে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে একটি নতুন সত্তা গঠনের উদ্যোগ চলছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং তাদের শেয়ার লেনদেনও স্থগিত রয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনো পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনায় আছে।

ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এক্সিম ব্যাংকে ডিএসইর ৪৮ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকে ১৯.৩৯ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১৬ কোটি টাকা এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ কোটি টাকা এফডিআর হিসেবে রাখা ছিল; যার মোট পরিমাণ ৮৭.৩৯ কোটি টাকা।

পরিস্থিতির অবনতি এবং আমানত ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি মাথায় রেখে ডিএসই তার এফডিআরের বড় অংশ ভেঙে নিরাপদ বিনিয়োগমুখী সরকারি ট্রেজারি বিলে স্থানান্তর করছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুন শেষে ডিএসইর মোট এফডিআর ছিল ৮৩২ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুন শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫৬ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডিএসই ৬৩৯ কোটি টাকা এফডিআর নগদায়ন করেছে এবং ২২৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এক বছর মেয়াদি ও দেড় বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক কর্মকর্তা জানান, বারবার অনুরোধ করেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো ডিএসইর আমানত ফেরত দিতে পারেনি। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী পরিচালনা পর্ষদের সময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুরবস্থা ততটা স্পষ্ট ছিল না, তাই তখন সেখানে এফডিআর করা হয়েছিল। তার ভাষায়, “২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন থেকে আমরা বারবার যোগাযোগ করলেও এফডিআরের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও টাকা ফেরত পাইনি।”

তিনি আরও জানান, “কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ব্যাংকগুলোকে একীভূত করছে। আমাদের জানানো হয়েছে যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে, এবং আমরা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।”

ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য বলেন, চলমান শেয়ারবাজারের মন্দা, কম লেনদেন এবং গত অর্থবছরে কোনো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় ডিএসইর বড় ভরসা ছিল অ-পরিচালন আয়ের উপর, যার বড় অংশ এসেছে সুদ আয়ের মাধ্যমে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আটকে থাকা ৮৭ কোটি টাকা ফেরত না পেলে ডিএসইর আর্থিক অবস্থায় বড় প্রভাব পড়বে এবং পুরো অর্থ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কর্তৃপক্ষ অর্থ উদ্ধারে কাজ করছে।”

বর্তমানে এই এফডিআরগুলো ‘ক্যারিং ভ্যালু’ হিসেবে হিসাবের খাতায় রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অস্থির শেয়ারবাজার ও কম লেনদেনের কারণে ডিএসই উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ে এবং পরিচালন লোকসান গুনেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফডিআরের সুদ, ভাড়া এবং সিসিবিএল ও সিডিবিএলের ডিভিডেন্ড মিলিয়ে অ-পরিচালন আয় ১২১ কোটি টাকা, যা পরিচালন আয়ের ১০১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র সুদ থেকেই এসেছে ৯৪ কোটি টাকা।

ওই অর্থবছরে ডিএসইর পরিচালন লোকসান ছিল ৪৯ কোটি টাকা, তবে অ-পরিচালন আয়ের ফলে অর্জিত ৩১ কোটি টাকার লাভ পূর্ববর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৬১.৩ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪৬% কম। অনেক পরিচালক ও কর্মকর্তা এই লোকসানের জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনীতি-সংকটজনিত বাজার অস্থিরতাকেই দায়ী করেছেন।

Share
নিউজটি ৪৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged