শিউর সিকিউরিটিজের গ্রাহকদের ৬৮ কোটি টাকার দাবি জমা পড়ল ডিএসইতে

সময়: শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫ ৬:১২:২৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাল ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও নগদ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত মশিউর সিকিউরিটিজের গ্রাহকদের কাছ থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এখন পর্যন্ত ৬৮ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি পেয়েছে। এক বছরেরও বেশি সময় আগে সংঘটিত এ জালিয়াতির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে তাদের দাবি দাখিল করছেন।

ডিএসইর উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুর রহমান জানান, মোট ৪৪ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর মধ্যে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার বিনিয়োগকারী তাদের আর্থিক ক্ষতির দাবি জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন বিনিয়োগকারী মশিউর সিকিউরিটিজ থেকে তাদের শেয়ার অন্য ব্রোকারেজ হাউসে স্থানান্তরের জন্য সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) নির্ধারিত ফরম-১৬ জমা দিয়েছেন।

তথ্য অনুযায়ী, মশিউর সিকিউরিটিজ তাদের কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) থেকে ৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। পাশাপাশি গ্রাহকদের শেয়ার বিক্রি করে আরও ৯২ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরিয়ে নেয়। প্রতিষ্ঠানটি নকল ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিনিয়োগকারীদের কাছে তাদের বিনিয়োগ অবস্থার ভুয়া তথ্য সরবরাহ করত, যার ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় ধরে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

চলতি বছরের অক্টোবরের শুরুতে ডিএসই প্রতারিত ব্রোকারেজ ফার্মটির ক্লায়েন্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ শেয়ার ও অর্থ হারানোর অভিযোগ জমা দিতে আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে মশিউর সিকিউরিটিজের বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবধারীদের তাদের শেয়ার অন্য ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, ডিএসই বর্তমানে মশিউর সিকিউরিটিজের ক্লায়েন্টদের সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তবে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ সুরক্ষা তহবিলে বিদ্যমান অর্থের তুলনায় বেশি হওয়ায় দাবি প্রো-রাটা ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর একটি বিধান অনুযায়ী, কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্টে জমা থাকা তহবিল থেকে অর্জিত সুদের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা দিতে হয়। মশিউর সিকিউরিটিজের জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায় গত বছরের আগস্টে, যখন ডিএসই সিসিএ-তে ৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঘাটতি শনাক্ত করে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার ও নগদ মিলিয়ে মোট ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

এই ঘটনার পর গত বছরের ১৯ আগস্ট ডিএসই মশিউর সিকিউরিটিজের ট্রেডিং কার্যক্রম এবং ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্ট (ডিপি) লাইসেন্স স্থগিত করে। একই সঙ্গে বিএসইসি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন বিনিয়োগকারী আগে ব্রোকারেজ ফার্মটির সঙ্গে পরিশোধ চুক্তিতে বসার দাবি জানিয়েছিলেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি বেআইনিভাবে বিক্রি করা শেয়ার পুনরায় কিনে ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো বিনিয়োগকারী শেয়ার বা অর্থ ফেরত পাননি।

বিএসইসির মুখপাত্র জানান, অতীতে ডিজিটাল জালিয়াতির একাধিক ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে প্রায় সব ব্রোকারেজ হাউসকে অভিন্ন ও টেম্পার-প্রুফ ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা যায়।

উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, ডন সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, ব্যাঙ্কো সিকিউরিটিজ ও শাহ মোহাম্মদ সগীরের মাধ্যমে সংঘটিত বড় কেলেঙ্কারিতে বিনিয়োগকারীরা ৩০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন এখনো স্থগিত রয়েছে।

মশিউর সিকিউরিটিজের ঘটনা সর্বশেষ বড় আত্মসাতের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা গত বছর আগস্টে খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন সিকিউরিটিজ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকাশ্যে আসে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গত বছরের ৩০ আগস্ট মশিউর সিকিউরিটিজের সিইও জিয়াউল হোসেন চিশতি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান এবং পরিচালক শেখ মোগল জান রহমানের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

বিএসইসি নিশ্চিত করেছে, এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মশিউর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

Share
নিউজটি ৬২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged