শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় সিদ্ধান্ত

সময়: সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬ ৫:৫০:০৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের দরপতন, তারল্যসংকট ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় বিপর্যস্ত দেশের শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যাংকগুলোর জন্য চালু করা বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগে এই সুবিধার মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বাজারে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধি সহায়ক হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতন চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, মূলধনের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা। ফলে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর বিশেষ বিনিয়োগ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, শেয়ারবাজারে তারল্যসংকট মোকাবিলা এবং ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশেষ তহবিল গঠনের নীতি চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনা মহামারির সময় শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ওই নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে। ব্যাংকগুলো নিজেদের অর্থায়নে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃক্রয় চুক্তি বা রেপো সুবিধার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এই তহবিল গঠনের সুযোগ পায়।

বিশেষ তহবিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এর আওতায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা অর্থ ব্যাংকগুলোর প্রচলিত শেয়ারবাজার বিনিয়োগসীমার বাইরে রাখা হয়। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত সাধারণ বিনিয়োগসীমার হিসাবের সঙ্গে বিশেষ তহবিলের বিনিয়োগ যুক্ত হয় না। ফলে নির্ধারিত শর্তের আওতায় ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সুযোগ পায়।

এদিকে বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর পরিমাণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু বিদ্যমান সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ তহবিলের আকারও বাড়ানো প্রয়োজন।

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ তহবিলের সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটি প্রতিটি ব্যাংকের জন্য বিদ্যমান ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।

একই সঙ্গে ডিবিএ বিশেষ তহবিল সুবিধার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটির প্রত্যাশা, তহবিলের পরিমাণ ও মেয়াদ বাড়ানো হলে ব্যাংকগুলোর জন্য শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। পাশাপাশি বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ারবাজারের চলমান সংকট থেকে উত্তরণে কেবল বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। এর সুফল পেতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হওয়া জরুরি। পাশাপাশি বাজারে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তাদের মতে, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল সুবিধা অব্যাহত থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাবে, তা নির্ভর করবে তাদের বিনিয়োগের সদিচ্ছা এবং বাজারের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর।

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধা বাস্তবে বাজারের তারল্যসংকট কমাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর।

Share
নিউজটি ২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged