নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পুঁজিবাজারকে লবিস্ট চক্রের প্রভাব ও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি সাত সদস্যের পর্যবেক্ষক সংস্থা (Oversight Body) গঠনের সুপারিশ করেছে শেয়ারবাজার টাস্কফোর্স। এই সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিসক্রিয় ভূমিকা থেকে বাজারকে রক্ষাও করবে বলে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে টাস্কফোর্স এ সুপারিশ করে। সেখানে বলা হয়, এই পর্যবেক্ষক সংস্থায় থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এবং অভিজ্ঞ বাজার বিশ্লেষকরা।
টাস্কফোর্সের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রস্তাবিত সংস্থাটি একটি কার্যকর বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এর মতই ভূমিকা পালন করবে, যারা নীতি পর্যালোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রদানে স্বাধীন থাকবে।
টাস্কফোর্সের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী কমিশন ও মন্ত্রণালয়ের কিছু সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারী স্বার্থকে উপেক্ষা করে লবিস্ট ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষে গেছে। এ প্রেক্ষাপটেই এই পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠনের প্রস্তাব এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সিদ্ধান্তের ফলে বিএসইসি ক্লোজ-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ ১০ বছর বাড়িয়ে দেয়, যা ছিল সম্পূর্ণরূপে কিছু অসাধু ফান্ড ম্যানেজারের পক্ষে। ফলে তারা নিয়মিত ম্যানেজমেন্ট ফি আদায় করতে সক্ষম হলেও, ইউনিটহোল্ডারদের কোন উল্লেখযোগ্য রিটার্ন দিতে পারেনি। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এই খাত থেকে উঠে গেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অযাচিত প্রভাব হিসেবে বলা হয়েছে, বিএসইসিকে প্রতিবছর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়মতো প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে। টাস্কফোর্স মনে করে, প্রস্তাবিত পর্যবেক্ষক সংস্থা থাকলে বিএসইসি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, এবং মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে সঠিক সময়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে।
বিএসইসির একক সিদ্ধান্তে আইপিও অনুমোদনের বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। যেমন, রিং শাইন টেক্সটাইলস-এর আইপিও প্রস্তাব ডিএসই কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানালেও, বিএসইসি সেটি অনুমোদন দেয়। পরে দেখা যায়, কোম্পানির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। টাস্কফোর্স বলছে, বাজার পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শুধু নীতিনির্ধারণমূলক ভূমিকায় থাকা প্রয়োজন।
বাজার স্থিতিশীল রাখার অজুহাতে ফ্লোর প্রাইস আরোপের মতো সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে বাজারের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এতে করে দেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়, যেখানে লবিস্টদের প্রভাবে অযোগ্য ব্যক্তিরা পদ পেয়ে যান— এমন অভিযোগ রয়েছে। টাস্কফোর্সের মতে, ভবিষ্যতে কমিশনের সদস্য নিয়োগের জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠন করে যোগ্যতা অনুসারে মনোনয়ন প্রক্রিয়া চালানো উচিত।
এছাড়া, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর ২০১১ সালে বিএসইসি একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, এফবিসিসিআই ও অর্থনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে মাত্র একবার বৈঠকের পর ২০১৪ সালের পর আর এই কমিটি বসেনি। ফলে টাস্কফোর্স মনে করছে, একটি কার্যকর পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠনে আইনি কাঠামো থাকা জরুরি, যাতে তা নিয়মিতভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।


