শেয়ারবাজারে ২০৮ কোটি টাকার কারসাজি: হিরু-সাকিব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিএসইসির রেকর্ড জরিমানা

সময়: সোমবার, জুন ২, ২০২৫ ১১:১৫:৩০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচিত শেয়ার ব্যবসায়ী ও সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক মো. আবুল খায়ের হিরু এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত এক ডজন কোম্পানির শেয়ারমূল্যে কৃত্রিম প্রভাব সৃষ্টির দায়ে হিরু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ২০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার রেকর্ড অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে।

সরকারি চাকুরিতে থেকে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের কারণে আবুল খায়ের হিরুকে কমিশনের পক্ষ থেকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে গত ১৩ মে বিএসইসি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, সমবায় অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকেও জানানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগেও ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর একই বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছিল বিএসইসি।

নতুন কমিশনের অধীনে কঠোর অবস্থান
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিকবার শেয়ার কারসাজির অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তবে সরকারের পরিবর্তনের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত বিএসইসি নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর হিরু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। কমিশন থেকে এবারের তদন্ত ও শাস্তির আওতায় বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকেও ছাড় দেওয়া হয়নি, যিনি আবুল খায়েরের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত।

বিএসইসির চিঠিতে কী আছে
অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবার এবং সহযোগীরা বিভিন্ন সময়ে একাধিক কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম ও কারসাজি করে শেয়ারবাজারকে প্রভাবিত করেছেন, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের জন্য বিভিন্ন সময় তাদের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে।

জরিমানা ও জড়িতদের বিবরণ
চিঠি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৯ জুন থেকে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আবুল খায়ের হিরু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এবং ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৭ মে পর্যন্ত ১৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকার আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়। সব মিলিয়ে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

গুরুত্বপূর্ণ কারসাজির ঘটনা ও জরিমানার বিবরণ
১. ১৯ জুন ২০২২:
গ্রিন ডেল্টা ও ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে হিরুর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান ও সহযোগীদের ৪২ লাখ এবং ৯৫ লাখ টাকা জরিমানা। এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের কারসাজির জন্য দেশ আইডিয়াল ট্রাস্ট কো-অপারেটিভকে ৭২ লাখ টাকা জরিমানা।

৬ জুলাই ২০২২:
ফরচুন সুজ ও এনআরবিসি ব্যাংকের শেয়ার কারসাজিতে হিরুর বাবা আবুল কালাম মাতবর ও বোন কনিকা আফরোজকে যথাক্রমে ১ কোটি ৫০ লাখ ও ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা।

২ আগস্ট ২০২২:
ওয়ান ব্যাংক ও বিডিকম অনলাইনের শেয়ার কারসাজিতে হিরুর বাবার প্রতিষ্ঠান ডিআইটি কো-অপারেটিভকে ৩ কোটি ও ৫৫ লাখ টাকা জরিমানা।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪:
প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে হিরু ও তার সহযোগীদের ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা। এর মধ্যে সাকিব আল হাসানকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫:
ফরচুন সুজে কারসাজির অভিযোগে হিরু ও তার স্ত্রীসহ সহযোগীদের ৭৭ কোটি ২১ লাখ টাকা জরিমানা। এ সময় হিরুকে ১১ কোটি এবং তার স্ত্রীকে ২৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়।

২ জানুয়ারি ২০২৫:
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের শেয়ার কারসাজিতে যথাক্রমে ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ এবং ৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা জরিমানা।

৯ এপ্রিল ২০২৫:
সোনালী পেপারের শেয়ার কারসাজিতে দু’দফায় ৫২ কোটি ও ২৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা জরিমানা। এর মধ্যে সাকিব আল হাসানকে মোট ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার জরিমানা।

৭ মে ২০২৫:
ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সে কারসাজির দায়ে হিরু ও সহযোগীদের ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা। সাকিবকে দেওয়া হয় ৩ লাখ টাকার জরিমানা।

Share
নিউজটি ১২৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged