সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আটকে কোটি কোটি টাকা, বড় ঝুঁকিতে তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২৫ ১:১২:৪৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান—যমুনা অয়েল, পদ্মা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম—তাদের আর্থিক অবস্থান নিয়ে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে রাখা মোট ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) আটকে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এফডিআরের মেয়াদ শেষ হলেও ব্যাংকগুলোর তীব্র তারল্য সংকটের কারণে অর্থ ছাড় সম্ভব হচ্ছে না।

আটকে থাকা এফডিআরগুলো রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে—যেগুলো এখন একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে কার্যক্রম শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে যমুনা অয়েল, যার আটকে থাকা অর্থ ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৭২০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৪৩২ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ২৮৯ কোটি এবং অন্যান্য ব্যাংকে আরও কিছু পরিমাণ আটকে আছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আটকে থাকা অর্থ ৫৪০ কোটি টাকা এবং পদ্মা অয়েলের ৩৩৯ কোটি টাকা।

১০% থেকে ১২.৫% সুদে এসব এফডিআর এতদিন তেল কোম্পানিগুলোর লাভজনক অ-পরিচালন আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। এ অবস্থায় বিশাল অঙ্কের এফডিআর আটকে যাওয়ায় তা এখন বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন অডিট ফার্মের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোয় একীভূতকরণ করা হলেও—তেল কোম্পানিগুলোর মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নিরীক্ষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই বিনিয়োগ এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুযায়ী যথাযথ ক্রেডিট লস প্রভিশন না রাখলে কোম্পানির সম্পদ অতিমূল্যায়িত দেখানো হতে পারে।

তিন প্রতিষ্ঠানের আটকে থাকা অর্থের তালিকা অনুযায়ী—যমুনা অয়েলের ১,৪৬০ কোটি, মেঘনার ৫৪০ কোটি এবং পদ্মা অয়েলের ৩৩৯ কোটি টাকা উদ্ধার-অনিশ্চয়তায় রয়েছে। কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেহেতু সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো এখন সরকারের অধীনে একীভূত হয়েছে, তাই অর্থ উদ্ধার পুরোপুরি সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তারা আরও বলেন, পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের ফলে এসব ব্যাংকে বিশাল অঙ্কের এফডিআর রাখা হয়েছিল—যার দায় বর্তমান ব্যবস্থাপনা বহন করছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসার মূল কার্যক্রমের পরিবর্তে সুদের আয়ে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে অগ্রিম ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া বিপুল অঙ্কের আমানত রাখায় ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলোর আয় ও ডিভিডেন্ড প্রদানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে—এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা সরকার দিচ্ছে এবং ১৫ হাজার কোটি টাকা আসছে ডিপোজিটকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সাধারণ ডিপোজিটরদের অর্থ সুরক্ষিত থাকবে এবং ডিপোজিট প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী প্রথম ধাপে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিরাপদ। তবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোর আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের অর্থ কবে ফিরে পাওয়া যাবে—তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।

Share
নিউজটি ৯৮ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged