“সিরিয়াল ট্রেডের” কবলে শেয়ার বাজার : প্রশ্নবিদ্ধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা

সময়: বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৪ ৫:৪২:১১ অপরাহ্ণ

তানভির আহমেদ : গত ১৫ বছর শেয়ার বাজার ঘুরে দাঁড়াতে না পারার অন্যতম কারন ছিল আইনের শাসন না থাকা। বেশির ভাগ দুষ্ট চক্র বিএসইসি’র আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক আইন ভঙ্গ করে গেছে। আর সেজন্যই আস্থার অভাবে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে সরে গিয়েছে।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে গত ৫ আগস্ট সাবেক হাসিনা সরকার পতনের পর শেয়ার বাজার নিয়ে আবার আশায় বুক বাঁধতে থাকে বিনিয়োগকারীরা। বিএসইসি’র নতুন কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু বন্ধ এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোর গত কয়েক দিন সিরিয়াল ট্রেড দেখে বিনিয়োগকারীরা আবার দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে।

১) খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগঃ গত ২৫ আগস্ট এই শেয়ারের দর ছিল ৭৮.৪ টাকা। মাত্র ১৩ কার্যদিবসের মধ্যে শেয়ারটি ৭৮.৪ টাকা থেকে ১৭২ টাকা উঠে যায়। একটি অসাধু চক্র “সিরিয়াল ট্রেড” করে মাত্র ১৩ দিনে এই বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের দর ১২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে।
এর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে এই বন্ধ কোম্পানির শেয়ারের দর ছিল ৯ টাকা। কারসাজি চক্র শেয়ারটি মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে ২৪০ টাকা দর উঠায়. ৪ মাসে “সিরিয়াল ট্রেড” করে শেয়ারটির দর বৃদ্ধি করা হয় ২৪০০ শতাংশ।

গত ৮ জুলাই ২০২৪ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বন্ধ “খান ব্রাদার্সের” শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে যুক্ত গোষ্ঠীটি কোম্পানিটির মালিকদের সঙ্গে একাধিক দফায় যোগাযোগ করে। এ সময় খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ কর্তৃপক্ষকে কোম্পানিটির ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার প্রস্তাব দেয় কারসাজিকারীরা।

কিন্তু কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ভালো লভ্যাংশ দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই। এক পর্যায়ে মালিকপক্ষ কারসাজিকারীদের হাতে কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তরেরও প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি কারসাজিকারীরা। এরপর কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দর বাড়িয়ে কারসাজিকারীরা মুনাফা তুলে নেয়ার চেষ্টায় রয়েছেন।

বন্ধ এই কোম্পানি গত বছর ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। লোকসানে থাকা এই কোম্পানিকে নিয়ে যারা চক্রান্ত করছে তাদের আগেই যদি শাস্তির আওতায় আনা যেত- তাহলে দ্বিতীয় দফায় বিনিয়োগকারীদেরকে আবার “সিরিয়াল ট্রেড” দেখতে হতো না। তাই দ্রুত খান ব্রাদার্স কোম্পানির কারসাজি চক্রের সদস্যদের আইনের আশ্রয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এই সাহস করতে না পারে।

ওরিয়ন ইনফিউশনঃ বিগত শিবলী কমিশনের সময় শেয়ার কারসাজির আরও একটি কালো অধ্যায়, “ওরিয়ন ইনফিউশন”। ২০২০ সালে দুর্বল এই কোম্পানির দাম ছিল ৭০ টাকা। “সিরিয়াল ট্রেড” করে মাত্র ৬ মাসে শেয়ারটির দর নিয়ে যাওয়া হয় ৯০০ টাকায়, যা প্রায় ১৩০০ শতাংশ। সেই সময় শেয়ারটি নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। জাগো নিউজ রিপোর্ট করে “শেয়ারবাজারে ‘আলাদিনের চেরাগ’ ওরিয়ন ইনফিউশন”। শেয়ারটি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হওয়ায় বিএসইসি ওরিয়ন ইনফিউশনের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়। যা আজও অন্ধকারে নিমজ্জিত।

নতুন করে আবার কারসাজি চক্র শেয়ারটি নিয়ে “সিরিয়াল ট্রেডের” করছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর শেয়ারটির দর ছিল ২৬৬ টাকা। ৪ দিনের ব্যাবধানে শেয়ার দর উঠে যায় ৩৭৮ টাকা। ৪ দিনে শেয়ারটি দর বৃদ্ধি পায় ১১২ টাকা। আগেই যদি এই শেয়ারটি পরিপূর্ণ তদন্ত হতো তাহলে আজ আবার এই শেয়ার নিয়ে “সিরিয়াল ট্রেড” করার সাহস পেত না।

গত ১০ দিনে খান ব্রাদার্স,ওরিয়ন ইনফিউশন ছাড়াও লিব্রা ইনফিউশন, বিকন ফার্মা, এনটিসি, মিডল্যান্ড ব্যাংক, নর্দান জুট, সোনালি আঁশ, আলহাজ টেক্সটাইল, ঢাকা ডাইং এ্যান্ড ম্যানুফেকচারিং, বিচ হেচারি সহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির টানা “সিরিয়াল ট্রেড” হয়েছে, যা অধিকাংশ বন্ধ এবং দুর্বল কোম্পানি।

বন্ধ এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোতে টানা “সিরিয়াল ট্রেড” বিএসইসি’র নতুন কমিশন এবং ডিএসই’র সার্ভিল্যান্সকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে যে কোন মূল্যে “সিরিয়াল ট্রেড” বন্ধ করতে হবে। যা সিকিউরিটি আইনেও একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অতীতেও বিভিন্ন সময় অনেক দুষ্কৃতিকারী “সিরিয়াল ট্রেড” এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করলে, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেই কোম্পানির ট্রেড দ্রুত বন্ধ করে তদন্ত শুরু করতো। এতে চাইলেই আর আইন লঙ্ঘন করে “সিরিয়াল ট্রেড” করা সম্ভব হতো না। যদিও শিবলী কমিশনের সময় এমন উদ্যোগ নিতে কখনো দেখা যায়নি।

আশা করি নুতন বিএসইসি’র কমিশন বন্ধ এবং দুর্বল কোম্পানি গুলোতে টানা “সিরিয়াল ট্রেড” হতে না পারে- সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। অন্যথায় নতুন কমিশনের উপর বিনিয়োগকারীদের যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা নষ্ট হয়ে যাবে।

Share
নিউজটি ৩৬৬ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged