নিজস্ব প্রতিবেদক: গত বছর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেয়ারবাজার সংস্কারকে অন্যতম বড় অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এক বছর পর এসে কমিশন তাদের ৩০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ফলাফল মিশ্র—জালিয়াতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বহু কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
সূচকের পরিবর্তে সংস্কারে অগ্রাধিকার
আগে বাজার সূচক বাড়াতে ব্রোকারদের শেয়ার কিনতে নিয়মিত চাপ দিত বিএসইসি। বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে সেই চর্চা বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রোকার হাউস সূত্রের মতে, এবার কমিশনের মূল অগ্রাধিকার সূচক বাড়ানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
জালিয়াতি দমনে কঠোর শাস্তি
গত এক বছরে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা শেয়ার কারসাজির মামলাগুলো নতুন করে সক্রিয় করেছে বিএসইসি। ১৯৯৩ সালের পর সর্বোচ্চ—১,১০০ কোটি টাকার বেশি জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। পূর্বে অবৈধ লাভের সর্বোচ্চ ২০% জরিমানা করা হলেও এখন তা ৯০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার কারসাজি মামলা, যেখানে পাঁচ প্রতিষ্ঠান ও চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা হয়। পাশাপাশি সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবায়াত-উল-ইসলামকে আজীবনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া ব্যবসায়ী আবুল খায়ের হিরু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১৯০ কোটির বেশি জরিমানা আরোপ হয়েছে, যার মধ্যে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নামও রয়েছে।
কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ
সরকার পরিবর্তনের পর গঠিত পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স আইপিও, মার্জিন ট্রেডিং ও মিউচুয়াল ফান্ড সংস্কারের প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান সিদ্দিকীর মতে, এসব প্রস্তাব আনতে এত দীর্ঘ সময় নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া এখন ডিজিটালাইজেশনের পথে, যা প্রভাব খাটানোর সুযোগ হ্রাস করবে। ডিএসই চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম আশা করছেন, চলতি বছরেই এটি পুরোপুরি চালু হবে।
নতুন বাজেটে বিও অ্যাকাউন্ট ফি ৪৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে, ব্রোকারদের টার্নওভার ট্যাক্স ০.০৫% থেকে ০.০৩%-এ নামানো হয়েছে এবং তালিকাভুক্ত ও অনতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট করের ব্যবধান আরও বাড়ানো হয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি
আগের সরকারের পতনের পর ডিএসইএক্স সূচক তিন দিনে ৫৮৯ পয়েন্ট বেড়ে ৬ হাজার ছাড়িয়েছিল। পরে তা নেমে আসে ৪,৬১৫ পয়েন্টে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার ৫,৩৫০ পয়েন্টের উপরে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজার অতিমূল্যায়িত ছিল না, তাই এই পুনরুদ্ধার স্বাভাবিক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—গত এক বছরে নতুন কোনো আইপিও আসেনি, বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডিএসই চেয়ারম্যান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা স্বচ্ছতার সংস্কৃতি গড়ে তুলছি। বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে ফিরছেন। লক্ষ্য পূর্ণ না হলেও আমরা সঠিক পথে আছি।”


