৫ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ গভর্নরকে আদালতে তলব

সময়: রবিবার, নভেম্বর ২, ২০২৫ ১১:২১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রায় ৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই এবং একই পদে নতুন কর্মী নিয়োগের উদ্যোগের ঘটনায় দেশের শীর্ষ ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের (আইবিবিএল) শীর্ষ কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত।

তলব করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা (এইচআর হেড) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

⚖️ আদালতের সমন ও মামলার প্রেক্ষাপট
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুম জানিয়েছেন, চাকরিচ্যুত দুই কর্মকর্তা— ইসলামী ব্যাংকের রাঙ্গামাটি শাখার সাবেক কর্মকর্তা এস. এম. এমদাদ হোসেন এবং চট্টগ্রামের হালিশহর শাখার জুনিয়র অফিসার মো. আরফান উল্লাহ— সম্প্রতি ঢাকার পঞ্চম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে একটি রেকর্ড ডিক্লারেশন মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ তিন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে সমন জারি করেছেন।

এই সমন জারি হয়েছে এমন সময়, যখন ইসলামী ব্যাংকে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার ও ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে নিয়োগ পরীক্ষা ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

? বাদীদের অভিযোগ: ‘আইন অমান্য করে গণবরখাস্ত’
বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৫ হাজার স্থায়ী কর্মীকে বরখাস্ত করেছে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন ও ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

তাদের দাবি, এই বরখাস্ত ছিল স্বেচ্ছাচারী, বৈষম্যমূলক ও আইনি এখতিয়ার-বহির্ভূত।

মামলায় বাদীরা আদালতের কাছে তিনটি মূল দাবি জানিয়েছেন—
১️⃣ বরখাস্ত আদেশকে বেআইনি ঘোষণা করা।
২️⃣ নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা।
৩️⃣ বরখাস্ত কর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাসহ পুনর্বহাল করা।

এছাড়া, তারা আদালতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন ইসলামী ব্যাংকের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখে, যতক্ষণ না বরখাস্তের বৈধতা বিষয়ে আদালতের রায় আসে।

? আদালতের নির্দেশ
অ্যাডভোকেট মাসুম বলেন,“আদালত ইসলামী ব্যাংকের এমডি, এএমডি, এইচআর হেড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আদালতে হাজির হয়ে এই গণবরখাস্ত ও পরিকল্পিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেছেন।”

তিনি আরও জানান, “আদালতের তলবের নোটিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ইতোমধ্যে পৌঁছেছে এবং তারা তা প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।”

⚙️ নিয়োগ পরীক্ষার আগে আইনি জটিলতা
আদালতের এই নির্দেশ এসেছে নিয়োগ পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে, যা ইসলামী ব্যাংকের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

আইনজীবীদের মতে, আদালতের এই পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি আদালত বরখাস্ত প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেন, তবে ইসলামী ব্যাংককে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।

? প্রেক্ষাপট
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, যেখানে কর্মী সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারের বেশি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটি গভর্ন্যান্স ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।

২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই কর্মীদের চাকরিচ্যুতি, শাখা পুনর্গঠন এবং পদায়ন সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে ব্যাংকের কর্মী ইউনিয়ন ও প্রাক্তন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছেন।

? বিশ্লেষণ
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাই সাধারণত তখনই হয় যখন প্রতিষ্ঠান কাঠামোগত পরিবর্তন, লোকসান পুষিয়ে ওঠা বা খরচ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেয়। তবে একই সঙ্গে নতুন নিয়োগের ঘোষণা এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা অপরিহার্য, কারণ এটি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

? উপসংহার
আদালতের তলবের মধ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক মানবসম্পদ সিদ্ধান্তগুলো এখন আইনি পরীক্ষার মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই মামলার ফলাফল শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, বরং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর দৃষ্টান্তমূলক প্রভাব ফেলবে।

 

Share
নিউজটি ১১৪ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged