বিপুল খেলাপি ঋণে চ্যালেঞ্জে ব্যাংক খাত

সময়: মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০২৪ ১১:৩১:২৭ অপরাহ্ণ

বিশেষ প্রতিবেদক: গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে পতিত সরকারের সহযোগীদের রেখে যাওয়া ব্যাংক খাতের ইতিহাসের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক নজিরবিহীন হারে বেড়েছে। ২০০৯ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সময় খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। সেই খেলাপি ঋণ এখন ২ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মার্চ শেষে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ১১ দশমিক ১১ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

তবে অপ্রকাশিত খেলাপি ঋণের চিত্র এর চেয়ে আরো ভয়ংকর। অবলোপন, আদালতের স্থগিতাদেশ, বিশেষ নির্দেশিত হিসাবে থাকা খেলপি ঋণের পরিমাণ হিসাব করলে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ হবে সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আড়াই লাখ কোটি টাকা অর্থঋণ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে মামলার কারণে আটকে আছে। ৬৬ হাজার কোটি টাকা রাইট অফ ( যে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা নাই) করা হয়েছে। ওই ঋণের হিসাব ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই দুইটি ক্যাটাগরি যোগ করলেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সূত্র বলছে, খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত বিপুল ঋণের ব্যাংকগুলো এখন নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। বিতরণকৃত ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে।
ব্যাংকের বড় গ্রাহকদের প্রায় সবাই পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ ও বিভিন্ন পদে থাকায় তদারকির বাইরেই ছিল এসব ঋণ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে তিন লাখ ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা, এর মধ্যে ২৭ শতাংশ খেলাপি; বেসরকারি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১২ লাখ ২১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা, এর মধ্যে ৭.২৮ শতাংশ খেলাপি; বিদেশি ব্যাংকগুলো বিরতণ করেছে ৬৬ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে ৫.২০ শতাংশ খেলাপি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছিল ৪০ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যার ১৩.৮৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

কোন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কত: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি, জনতা ব্যাংকের ৩০ হাজার ৪৯৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৩৫৭ কোটি এবং অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি খাতের বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসির (বিডিবিপি) খেলাপি ঋণ ৮৭৩ কোটি টাকা। মার্চ শেষে সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ২৭ শতাংশই খেলাপি। যদিও আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রাখতে হবে।

অপরদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা; যা বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। আইএমএফ এটি ৫ শতাংশের নিচে রাখতে বলেছে।

বিদেশি ব্যাংকগুলোতে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা; যা বেড়ে হয়েছে ঋণের ৫ দশমিক ২ শতাংশ।

বিশেষায়িত দুই ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

যে কারণে বাড়ছে খেলাপি ঋণ: তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঋণখেলাপি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একের পর এক ছাড় দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালের পর প্রথমেই খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা শিথিল করে তিন মাস সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ঋণ পুনর্গঠনের নামে দেওয়া হয় খেলাপিদের বিশেষ সুবিধা। ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রেও দেওয়া হয় বিশেষ ছাড়। ২০১৯ সালে ২ শতাংশ কিস্তি দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।

এরপর করোনা শুরু হলে সব ধরনের ঋণগ্রহীতার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করার সুবিধা দেয়। এ সময় কিছু ভালো ঋণগ্রহীতাও ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। সদ্য বিদায়ী গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর হিসেবে এসেই ঋণখেলাপিদের গণছাড় দিয়ে নতুন এক নীতিমালা জারি করেন। নতুন নীতিমালায় আড়াই থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়।

আগে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে জমা দিতে হতো ১০ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ। এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ পাঁচ থেকে আট বছরে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়। আগে এসব ঋণ শোধ করতে সর্বোচ্চ দুই বছর সময় দেওয়া হতো।

নতুন নীতিমালায় খেলাপি ঋণের সুবিধা প্রদান ও পুনঃতফসিলের ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে ছেড়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংক মালিকরাই ঠিক করেন কোন ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পাবে। আগে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগত। এর ফলে খেলাপি ঋণ আড়াল করার সুযোগ আরও বেড়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঋণ অবলোপন নীতিমালা শিথিল করা হয়। সর্বশেষ ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে আরও এক দফা ছাড় দেওয়া হয় গত এপ্রিলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়ে দেয়, কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও গ্রুপভুক্ত অন্য প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারবে। এতে ঋণখেলাপি কোম্পানির নতুন ঋণ পাওয়ার দরজা খুলে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়, যা নতুন ঋণ দিতে ব্যাংকের সামর্থ্য কমিয়ে দেয়। এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়; এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখা দেয়। মূলধন ঘাটতি থাকলে লভ্যাংশ ঘোষণা করা যায় না; ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। হতাশা থেকে তারা শেয়ার বিক্রি শুরু করলে ওই ব্যাংকের শেয়ার মূল্য আরও কমে যায়। এতে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে সুদ আয় খাতে দেখানো যায় না; তাই ব্যাংকের আর্থিক চিত্র আরও খারাপ দেখা যায়।

এছাড়া অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। বেকারত্বের হার বেড়ে যায়। খেলাপি ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ফলে দেশের রিজার্ভ কমে যায়। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের রিজার্ভ ধারাবাহিক কমার পেছনে খেলাপি ঋণ পাচার হয়ে যাওয়া একটা বড় কারণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতি মাসে বাণিজ্যের আড়ালে অন্তত দেড় বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছিল।

Share
নিউজটি ২৪৮ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged