নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বাধ্যবাধকতা হলো—বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে ঘোষিত ডিভিডেন্ড শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা। কিন্তু এই নিয়ম অমান্য করেছে দেশের ১৭টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি, যারা নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আট মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো ঘোষিত ডিভিডেন্ড প্রদান করেনি। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
ডিভিডেন্ড বিতরণে এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। গত এপ্রিলে বিএসইসি ডিভিডেন্ড বিতরণে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছিল, কিন্তু পাঁচ মাস কেটে গেলেও এখনো তারা সেই ডিভিডেন্ড বিতরণ সম্পন্ন করতে পারেনি।
১২ কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন
ডিভিডেন্ড বিতরণে ব্যর্থতার কারণে মূল বোর্ডের ১২টি কোম্পানি ইতিমধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন ঘটেছে।
‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পড়লে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করতে হয় এক দিন বেশি সময় নিয়ে, কারণ এই ক্যাটাগরিতে শেয়ার টি+৩ নিয়মে নিষ্পত্তি হয়, যেখানে সাধারণ ক্যাটাগরিতে টি+২ দিনেই সেটেলমেন্ট সম্পন্ন হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এটি এক ধরনের ‘শাস্তি’, কিন্তু বাস্তবে এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরাই।
বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, এই ব্যর্থতার জন্য মূলত কোম্পানির পরিচালকবৃন্দই দায়ী, কারণ তারা নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব পর্যালোচনার পর ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিলেন এবং তা সাধারণ সভায় অনুমোদিত হয়েছিল। ফলে বিনিয়োগকারীরা নয়, বরং পরিচালকদেরই দায়ী করা উচিত, বলে অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা মত দিয়েছেন।
ডিভিডেন্ড বিতরণে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর তালিকা
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, মূল বোর্ডের ১২টি কোম্পানির মধ্যে ১০টি কোম্পানি এক টাকাও ডিভিডেন্ড বিতরণ করেনি।
এর মধ্যে রয়েছে—
লুব-রেফ (বাংলাদেশ), আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং, সাইফ পাওয়ার টেক, আমরা টেকনোলজিস এবং ফরচুন সুজ—যারা মাত্র ১% ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেও তা বিতরণ করেনি।
অন্যদিকে, ওরিয়ন ফার্মা ও আমরা নেটওয়ার্কস ঘোষণা করেছিল ১০% ক্যাশ ডিভিডেন্ড, এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ১.৭৫%, এবং এসএস স্টিলস ২% ক্যাশ ডিভিডেন্ড—কিন্তু কেউই তা কার্যকর করেনি।
আংশিক ডিভিডেন্ড বিতরণ করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে—
আফতাব অটো মোবাইলস, যারা ঘোষিত ১০% ক্যাশ ডিভিডেন্ডের মাত্র ১২.০৬% বিতরণ করেছে,
এবং এডভেন্ট ফার্মা, যারা ঘোষিত ১% ডিভিডেন্ডের ৪০.২১% শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে দিয়েছে।
এসএমই মার্কেটেও অনিয়ম
এসএমই মার্কেটেও একই ধরনের অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে।
বিডি পেইন্টস (১২%), ওরাইজা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ (৫%), এবং মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ (৪%)—এই তিনটি কোম্পানি ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও এক টাকাও বিতরণ করেনি।
আংশিক ডিভিডেন্ড বিতরণ করেছে—
হিমাদ্রি লিমিটেড (৭৭.৩৭%), বেঙ্গল বিস্কিটস (৬২.১৩%), এবং মাস্টারফিড এগ্রোটেক (১৪.৫৯%)।
এই কোম্পানিগুলোর অর্থবছর ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়, এবং ডিএসইর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বিএসইসি’র অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিএসইসি পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, “যেসব কোম্পানি ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেও তা বিতরণ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলছে। শুনানিতে কোম্পানির পরিচালকবৃন্দকে ডাকা হবে এবং এরপর বিষয়টি কমিশন সভায় উপস্থাপন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশন শিগগিরই কঠোর ব্যবস্থা নেবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড বিতরণে গড়িমসি না করতে পারে।”
কিছু কোম্পানির ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
তবে ইতিবাচক দিক হলো—তালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানি, যথা আরএকে সিরামিকস, সি পার্ল, নাভানা সিএনজি এবং জেনেক্স ইনফোসিস—নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কয়েক মাস বিলম্বে তাদের ঘোষিত ডিভিডেন্ড সম্পূর্ণভাবে বিতরণ করেছে।
আরএকে সিরামিকসের কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, “সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড নির্ধারিত সময়েই বিতরণ করা হয়েছে। তবে এনবিআর আন্দোলনের কারণে আমাদের হোল্ডিং কোম্পানির অংশ বিলম্বে বিতরণ করতে হয়েছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএসইসি’র নরম মনোভাব কোম্পানিগুলোর অনিয়মকে উৎসাহিত করছে। সময়মতো ডিভিডেন্ড না দেওয়ার এই প্রবণতা দমন না করা গেলে, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়বে।


