নিরীক্ষায় গুরুতর দুর্বলতা: ২৭ বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে সতর্কতা

সময়: সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ১১:৫৪:০৩ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: তালিকাভুক্ত ২৭টি বীমা কোম্পানির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুতর অডিট পর্যবেক্ষণ উঠে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের মতে, এসব অনিয়ম ও দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজারের স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

২০২৪ অর্থবছরের বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার পর বিএসইসি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিগুলোর সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষকরা তাদের অডিট রিপোর্টে একাধিক গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিকূল মতামত, কোয়ালিফাইড মতামত, বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ, ‘গোয়িং কনসার্ন’ সংক্রান্ত ঝুঁকি এবং বস্তুগত অনিশ্চয়তা। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অডিট মতামত সাধারণত আর্থিক প্রতিবেদন, কর্পোরেট সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

বিএসইসি মনে করে, এই নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণগুলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ, আর্থিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শেয়ারবাজারের সামগ্রিক আস্থাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে বীমা খাত যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা ও জনগণের আস্থার ওপর পরিচালিত হয়, তাই এ ধরনের দুর্বলতা আরও বেশি উদ্বেগজনক।

বিএসইসি কর্তৃক চিহ্নিত বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে— এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ, জনতা ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, রূপালী ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, সিকদার ইন্স্যুরেন্স, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স।

বিএসইসির কর্পোরেট রিপোর্টিং বিভাগ থেকে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে বিশেষভাবে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি এবং বস্তুগত অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব পর্যবেক্ষণ সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনা এবং পলিসি হোল্ডারদের প্রতি দায় পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং বীমা খাতের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ’র দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে উন্নত তদারকি, বিশেষ বা ফরেনসিক অডিট এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে বিএসইসি।

বিএসইসি জানিয়েছে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কমিশনের ধারণা, আইডিআরএ’র সময়োপযোগী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ বীমা খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন জোরদার করতে সহায়ক হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসি ও আইডিআরএ’র এই সমন্বিত উদ্যোগ বীমা খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সংশোধনমূলক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে খাতটির বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাতটি আরও টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে দেশে মোট ৮২টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৫৮টি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত, যা খাতটির একটি বড় অংশ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৩টি নন-লাইফ (সাধারণ) এবং ১৫টি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।

 

Share
নিউজটি ৭২ বার পড়া হয়েছে ।
Tagged