নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে বিলুপ্ত করে একীভূত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে এসব ব্যাংকের হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে থাকা শেয়ারের কোনো মূল্য আর অবশিষ্ট নেই এবং তাঁরা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজোলিউশন বিভাগ জারি করা এক আদেশে জানানো হয়, ৫ নভেম্বর ২০২৫ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ক্ষমতাবলে পাঁচটি ব্যাংকের ইস্যুকৃত সব শেয়ার বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে শেয়ারহোল্ডাররা তাদের মালিকানা স্বত্ব, ভোটাধিকার এবং ভবিষ্যৎ ডিভিডেন্ড পাওয়ার সব অধিকার হারিয়েছেন। এমনকি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি প্রতিকার গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮২০ কোটি টাকা এবং মোট শেয়ার সংখ্যা ছিল ৫৮২ কোটি। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
পরিসংখ্যান বলছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৬৫ শতাংশ শেয়ারই ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানায়। অন্যদিকে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ৬৮ শতাংশের বেশি। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা ঋণ জালিয়াতিতে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কোনো দায় না থাকলেও সবচেয়ে বড় ক্ষতির বোঝা তাঁদেরই বহন করতে হচ্ছে। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এদিকে, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে ২ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করেছে। ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে গঠিত এই ব্যাংকে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে আমানতকারীদের জমানো অর্থ শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে।
মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে চেয়ারম্যান করে মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে নতুন ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যদিও এই একীভূতকরণের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তবে ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন—যা শেয়ারবাজারে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।


