নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে শেয়ারবাজারেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর শীর্ষ নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিনিয়োগকারী, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংকার এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে। বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদে থাকা বা না থাকার বিষয়ে বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিশ্লেষণ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
যদিও তার বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতি বা নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ নেই, তবুও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা এবং গত দেড় বছরে নতুন কোনো আইপিও না আসা তার নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ধারাবাহিক সূচক পতন, লেনদেনের খরা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতার কারণে শেয়ারবাজারে হতাশা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রধান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর সূচক ও লেনদেন বহুবার নিম্নমুখী হয়েছে। এক সময় যে বাজারে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো, বর্তমানে তা সীমিত পরিসরে আটকে যাচ্ছে। তাদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বাজারের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
বিগত দুই দশকে বাজারে তৈরি হওয়া সংকট—দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি, কারসাজি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারণে অস্থিরতা—মোচনের জন্য শক্ত নেতৃত্বের প্রয়োজন।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী উল্লেখ করেছেন, শেয়ারবাজারে সংস্কার ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পেশাদার ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত নেতৃত্ব অপরিহার্য। তিনি আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে মার্কিন জোসেফ পি. কেনেডি সিনিয়র এবং ভারতীয় জি. এন. বাজপাই-এর মতো ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা বাজার সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীর বড় অংশ মনে করছেন, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে পুঁজিবাজারের জটিল সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সরকারি আমলার নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখন বাজার সংশ্লিষ্টরা চাইছেন করপোরেট পটভূমি ও পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পেশাজীবীদের নেতৃত্ব। তারা বিশ্বাস করেন, বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত এবং সময়োপযোগী নীতিমালা ছাড়া আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, শুধুমাত্র ভালো নেতৃত্বই যথেষ্ট নয়; বাজারে মানসম্মত কোম্পানি এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। শক্তিশালী আইপিও পাইপলাইন, বন্ড মার্কেটের সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং কর নীতির স্বচ্ছতা—এসব বিষয়ও শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে নতুন নেতৃত্বকে কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল নিয়েও এগোতে হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে সরকার যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে, তবে শেয়ারবাজারে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হতে পারে। বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাজারকে এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


